ঢাকা   ০২:১৮:১১ পিএম, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেঘনায় গ্রাম আদালত অচল, থানায় চলছে বিচার

মেঘনা প্রতিনিধি
  • Update Time : Monday, June 22, 2026,
  • 250 Time View

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় স্থানীয় পর্যায়ে সহজ, দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত গ্রাম আদালতের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক এ বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ বিরোধ নিষ্পত্তি হচ্ছে থানা প্রাঙ্গণের গোলঘরে কিংবা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে। ফলে প্রান্তিক জনগণ আইনি কাঠামোর বাইরে বিচার পেতে বাধ্য হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, মারামারি, হুমকি-ধমকি, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষুদ্র ফৌজদারি ঘটনার অভিযোগ প্রথমে থানায় জমা হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে পাঠান। পরবর্তীতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তি কিংবা প্রভাবশালীদের উপস্থিতিতে থানা প্রাঙ্গণের গোলঘরে বৈঠক বসিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এসব বৈঠকে অনেক সময় আপস-মীমাংসা হলেও তা গ্রাম আদালতের আইনানুগ প্রক্রিয়ার আওতায় হয় না। কোনো লিখিত রায়, সিদ্ধান্তের নথিভুক্তি কিংবা আপিলের সুযোগ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ ভবিষ্যতে আইনি জটিলতার মুখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী পক্ষের চাপে দুর্বল পক্ষ আপস করতে বাধ্য হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আদালত গঠনের বিধান রয়েছে। আদালতে বাদী ও বিবাদীপক্ষ একজন করে সদস্য মনোনয়ন দেন এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। বিচার কার্যক্রমের নোটিশ প্রদান, সাক্ষ্য গ্রহণ, লিখিত রায় সংরক্ষণ ও নথিভুক্তিরও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব বিধান অনেক ক্ষেত্রেই অনুসরণ করা হচ্ছে না।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অনেক ইউনিয়নে নিয়মিত গ্রাম আদালতের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় না। অনেক জনপ্রতিনিধি গ্রাম আদালত পরিচালনায় আগ্রহী নন। আবার কোথাও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, জনবল ও প্রশাসনিক সহায়তার অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বও এ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জনপ্রতিনিধি বলেন, “অনেক সময় থানায় অভিযোগ হওয়ার পর পুলিশ দুই পক্ষকে ডাকে। তখন স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু গ্রাম আদালতের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না।”
অপরদিকে একাধিক বিচারপ্রার্থী অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পরিষদে বিচার চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের থানায় যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়। ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ের বিচারব্যবস্থা ব্যবহার না করেই বিরোধ নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা গ্রাম আদালতের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আইনজীবী ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাম আদালতকে উপেক্ষা করে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে বিচার নিষ্পত্তির প্রবণতা আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক। এতে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কমে যায় এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি আদালতে মামলা কমানো এবং থানার ওপর চাপ হ্রাসের যে লক্ষ্য নিয়ে গ্রাম আদালত চালু করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নিয়মিত গ্রাম আদালতের অধিবেশন নিশ্চিত করা, জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ প্রদান, বিচার কার্যক্রমের তদারকি বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে আপস-মীমাংসার নামে আইনি কাঠামোর বাইরে পরিচালিত বিচার প্রক্রিয়া নিরুৎসাহিত করারও প্রয়োজন রয়েছে।
প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত গ্রাম আদালত ব্যবস্থা মেঘনায় কার্যকর না হলে সাধারণ মানুষের বিচারপ্রাপ্তির অধিকার আরও সংকুচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি