• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

মেঘনা-তিতাস উপজেলার চরের জমি দ্বন্দ্বে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরি, হতে পারে হতাহত

বিপ্লব সিকদার / ৪৯ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

কুমিল্লার মেঘনা ও তিতাস উপজেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। জমির মালিকানা ও দখলকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানি ও আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুই উপজেলার সাধারণ মানুষ আজ উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যে বিরোধ একসময় ভূমি-সংক্রান্ত একটি প্রশাসনিক ও আইনি সমস্যা ছিল, তা এখন সামাজিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সংঘর্ষের ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে।
মেঘনা উপজেলার আলীপুর গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, বর্তমানে তিতাস উপজেলার নতুন বাটেরা ও চর কাঠালিয়া গ্রামের লোকজন যে জমি ভোগদখল করছে, তার বড় অংশ তাদের পূর্বপুরুষদের মালিকানাধীন। অন্যদিকে নতুন বাটেরা ও চর কাঠালিয়ার বাসিন্দারাও নিজেদের অধিকারের কথা বলছেন এবং জমি ছাড়তে নারাজ। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সংঘর্ষের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বরং উভয় পক্ষের লোকজনকে নিজ নিজ অবস্থানে শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বিরোধপূর্ণ এলাকার উল্লেখযোগ্য অংশের জমি বিএস রেকর্ডে খাস জমি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত বিষয় আদালতে বিচারাধীন। যদি তা সত্য হয়ে থাকে, তাহলে আদালতের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের পক্ষেই সেখানে একতরফাভাবে মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কিংবা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দখল নিশ্চিত করার সুযোগ নেই। আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি স্পষ্ট। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চরাঞ্চলে আইন ও প্রশাসনের উপস্থিতি অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সেই সুযোগে সংঘাত আরও জটিল হয়ে ওঠে।
চরাঞ্চলের জমি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের নতুন কোনো ঘটনা নয়। মেঘনা, যমুনা কিংবা পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় বছরের পর বছর ধরে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে নতুন চর জেগে ওঠে, আবার বিলীনও হয়ে যায়। নতুন চর সৃষ্টি হলে মালিকানা, রেকর্ড, খাস জমির শ্রেণিবিন্যাস এবং ভোগদখল নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন সামনে আসে। এসব প্রশ্নের দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং একসময় তা সহিংসতায় রূপ নেয়।
মেঘনা-তিতাস সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতিও সেই চিত্রেরই পুনরাবৃত্তি। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সংঘর্ষে জড়িতদের বড় অংশই সাধারণ কৃষক, দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ। যারা প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসার চালান, তারাই এখন কাজ ফেলে জমি পাহারায় ব্যস্ত। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় নয়; বরং সামাজিক অস্থিরতারও ইঙ্গিত। যখন একটি গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামের মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সম্প্রীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রশ্ন হলো, এতদিন ধরে চলে আসা বিরোধ হঠাৎ করে এখন কেন এত তীব্র আকার ধারণ করল? এর পেছনে কি কেবল জমির মালিকানার প্রশ্ন কাজ করছে, নাকি অন্য কোনো স্বার্থগোষ্ঠী পরিস্থিতিকে উসকে দিচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতীতে দেখা গেছে, চরাঞ্চলের জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল সাধারণ মানুষকে সামনে রেখে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে। ফলে মেঘনা-তিতাস সীমান্তের বর্তমান সংকটেও এমন কোনো গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং সংঘর্ষের আগেই উত্তেজনা প্রশমনের ব্যবস্থা নেওয়া। বর্তমান বাস্তবতায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং ভূমি প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। শুধু অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও স্থায়ী সমাধান আসবে না।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন বিরোধপূর্ণ এলাকার বাস্তব অবস্থা নির্ধারণ করা। জমির প্রকৃত মালিকানা, রেকর্ড, আদালতে চলমান মামলার অবস্থা এবং সরকারি খাস জমির পরিমাণ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। গুজব ও বিভ্রান্তি দূর করতে প্রশাসনকে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কারণ তথ্যের অভাব অনেক সময় সংঘর্ষকে আরও উসকে দেয়।
একই সঙ্গে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে মেঘনা ও তিতাস উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ মধ্যস্থতা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনবে এবং উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেবে।
আদালতের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত জমিতে নতুন করে কোনো দখল, স্থাপনা নির্মাণ কিংবা চাষাবাদ বন্ধ রাখতে হবে। প্রয়োজনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই এলাকায় বিশেষ নজরদারি জোরদার করতে হবে। যদি জমি খাস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে, তাহলে তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো পক্ষ যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। স্থানীয়ভাবে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তা যেকোনো সময় নতুন করে সংঘর্ষের জন্ম দিতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটি গুজব, একটি উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা একটি ছোট ঘটনা বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তখন শুধু কয়েকজন ব্যক্তি নয়, পুরো এলাকার শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
তাই প্রশাসনের উচিত ঘটনাকে সাধারণ গ্রামীণ বিরোধ হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা। প্রয়োজন হলে বিরোধপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে উসকানিদাতা ও সংঘর্ষ সৃষ্টির চেষ্টা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের চরাঞ্চল বাস্তবতার কারণে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এসব বিরোধকে সহিংসতা ও প্রাণহানির দিকে যেতে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মেঘনা-তিতাস সীমান্তের বর্তমান উত্তেজনা সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সংলাপভিত্তিক সমাধানের উদ্যোগই পারে এই সংকট নিরসন করতে। আরেকটি রক্তক্ষয়ী ঘটনার অপেক্ষা না করে এখনই কঠোর ও কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। চরবাসীর জীবন, সম্পদ এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে সেটিই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক -সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন