সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ৫০০টি। পূজাকে কেন্দ্র করে সরকার আর্থিক সহায়তা, সরকারি ছুটি সম্প্রসারণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। তবে পূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলার ৩৪টি ঘটনার তথ্য সামনে আসায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের ৩০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশে ৩২ হাজার ৩৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়েছিল। চলতি বছর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে। অর্থাৎ এক বছরে মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি থেকে সরাসরি হিন্দু জনসংখ্যা বা ধর্মীয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকার হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৭ অক্টোবর হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর দুই ধর্মীয় উৎসবের জন্য মোট ৮ কোটি টাকার বরাদ্দের চেক হস্তান্তর করেন। এর মধ্যে দুর্গাপূজার জন্য ৫ কোটি এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কঠিন চীবর দান উৎসবের জন্য ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট দুর্গাপূজার জন্য ৪ কোটি টাকা চেয়েছিল। সরকার সেই প্রস্তাবের চেয়ে ১ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেয়। একইভাবে বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের চাওয়া ২ কোটি টাকার পরিবর্তে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অর্থ বিতরণের কথা জানানো হয়েছে।
তবে ৫ কোটি টাকা দেশের সব পূজামণ্ডপকে সমান হারে দেওয়া অনুদান নয়। কোন মণ্ডপ কত টাকা পেয়েছে, অর্থ বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে কি না এবং জাতীয় বরাদ্দের বাইরে স্থানীয় প্রশাসন কত টাকা দিয়েছে—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত হিসাব প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় পর্যায়েও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও বাসসের ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের আওতাধীন ১৬৮টি পূজামণ্ডপে মোট ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছে। তবে এই অর্থের উৎস এবং জাতীয় বরাদ্দের সঙ্গে হিসাবের কোনো পুনরাবৃত্তি আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বরাদ্দপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটিও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নবমী ও দশমীর পাশাপাশি ২২ অক্টোবর সরকারি ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের বিরতি তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তায় পুলিশ, আনসার ও বিজিবি
দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করতে দেশজুড়ে সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। ১১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের এক বৈঠকে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির জানান, পূজার আগে, পূজা চলাকালে, প্রতিমা বিসর্জনের সময় এবং পরবর্তী পর্যায়ে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং কোনো গোষ্ঠী যাতে উৎসব বিঘ্নিত করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ও জনসমাগমপূর্ণ মণ্ডপে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন, সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট স্থাপন এবং সন্দেহজনক তৎপরতা শনাক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের সময় ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারির প্রস্তুতি এবং গুজব মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির কথাও জানানো হয়েছে।
১৫ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা দেশে ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে সীমান্তবর্তী প্রায় ১ হাজার ৮০০টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বিজিবির ১৮টি বেস ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। সীমান্ত এলাকায় টহল বৃদ্ধি এবং পূজা কমিটিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথাও জানিয়েছে বিজিবি।
তবে আনসার-ভিডিপির উল্লেখিত সদস্যসংখ্যার কতজন সরাসরি মণ্ডপের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এবং কতজন অন্যান্য দায়িত্ব পালন করছেন, তা আলাদাভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে বিজিবির ১৮টি বেস ক্যাম্প স্থাপনের অর্থ এই নয় যে প্রতিটি সীমান্তবর্তী মণ্ডপে সার্বক্ষণিক বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছেন।
পূজার আগে ৩৪টি সহিংসতার অভিযোগ
সরকারের নিরাপত্তা প্রস্তুতির পাশাপাশি পূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলার অভিযোগও সামনে এসেছে। ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের বরাত দিয়ে বলা হয়, প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা ও সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ৩৪টি ঘটনা সংগঠনটি নথিভুক্ত করেছে। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা জানান, এসব ঘটনার মধ্যে ১১টি মামলায় গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলার ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তবে ৩৪টি ঘটনা পূজা উদ্যাপন পরিষদের দেওয়া হিসাব; একে সরকারি তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনার সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। একইভাবে ১১টি মামলায় গ্রেপ্তারের তথ্য থেকে সব ঘটনায় অপরাধী শনাক্ত হয়েছে কিংবা বিচার সম্পন্ন হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
ঘটনাগুলোর প্রকৃতি, মামলা নম্বর, ক্ষয়ক্ষতি, গ্রেপ্তার এবং তদন্তের অগ্রগতি যাচাই করা প্রয়োজন। পূজা উদ্যাপন পরিষদের বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা শুধু উৎসবের কয়েক দিনের জন্য নয়, সারা বছর নিশ্চিত করা জরুরি।
এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তখন পর্যন্ত কোনো পূজামণ্ডপকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেনি। তিনি নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কথাও জানান। তবে পূজার আগে ৩৪টি ঘটনার অভিযোগ সামনে আসায় ঝুঁকি মূল্যায়ন, অভিযোগ যাচাই এবং অপরাধ প্রতিরোধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুদান ও নিরাপত্তা বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা
দুর্গাপূজার জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৫ কোটি টাকা ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপ দিয়ে ভাগ করলে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৭৬ টাকা হয়। তবে এটি কেবল গাণিতিক তুলনা; প্রকৃত মণ্ডপভিত্তিক অনুদানের হিসাব নয়। কারণ বরাদ্দের অর্থ ট্রাস্ট ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণের কথা জানানো হয়েছে এবং সব মণ্ডপ সমান অর্থ পাবে—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
কোন মণ্ডপ কত টাকা পেয়েছে, বরাদ্দের অর্থ ছাড় ও বিতরণের হিসাব কীভাবে নিরীক্ষা করা হবে, স্থানীয় প্রশাসন অতিরিক্ত কত অর্থ দিয়েছে এবং হামলার অভিযোগে দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে সরকারি সহায়তা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন সহজ হবে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় আর্থিক বরাদ্দ, ছুটি সম্প্রসারণ এবং ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে উৎসব নির্বিঘ্ন হওয়ার প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে পূজার সময় নতুন কোনো সহিংসতা প্রতিরোধ, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।