https://bindubanglatv.com/
নিজস্ব প্রতিবেদক: শারদীয় দুর্গাপূজার আগে দেশের ৩৪টি স্থানে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে এসব ঘটনার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে ঘটনাগুলো পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিরোধ, মন্দিরের নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব, সরকারি অনুদান বণ্টন নিয়ে বিরোধ এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
যাচাইয়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি ঘটনায় প্রতিমা বা মন্দিরের ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেগুলোর পেছনে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের উদ্দেশ্য ছিল—এমন তথ্য মেলেনি। কোথাও দুই পরিবারের বিরোধ, কোথাও একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ, আবার কোথাও প্রতিমা পরিবহন ও স্থাপনের সময় দুর্ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে সব ঘটনার প্রকৃতি সম্পর্কে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে প্রতিমা নামানোর সময় ক্ষতি গত ১৬ অক্টোবর দুপুরে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার রামচন্দ্রদী মধ্য মনিপাড়া সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপনের সময় অসুরের ডান হাত সামান্য ভেঙে যায়। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাড়ি থেকে প্রতিমা নামানোর সময় অসাবধানতাবশত এ ঘটনা ঘটে। মণ্ডপের সভাপতি মোহন বাশি দাস ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব চন্দ্র দাসও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় আড়াইহাজার থানায় ১৭ অক্টোবর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
ময়মনসিংহে পারিবারিক বিরোধে ভাঙে গণেশমূর্তি গত ৫ অক্টোবর বিকেলে ময়মনসিংহ নগরের কোতোয়ালি থানার ঋষিপাড়া এলাকায় সুপারি পাড়া নিয়ে পল্লব দাসের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী জীবন ঋষির পরিবারের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে জীবন ঋষি, তাঁর ছেলে জয়ন্ত ও ভাগ্নে রায়মোহন প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ময়না রানী দাস (৫৮) আহত হন। একই ঘটনায় মণ্ডপের সামনে রং করার জন্য রাখা গণেশমূর্তির কিছু অংশ ভেঙে যায়। মণ্ডপের সভাপতি নৃপেন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক পরিমল চন্দ্র দাস জানান, দুই পরিবারের পূর্ববিরোধের জেরেই এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় জিডি করা হয়।
পাবনায় শামিয়ানা ছেঁড়েন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী গত ১৫ অক্টোবর সকালে পাবনার সুজানগর উপজেলার ভায়না এলাকায় মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন রাধানগর সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের পূজামণ্ডপের শামিয়ানা ছিঁড়ে ফেলেন এক নারী। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারী ঘটনার আগে চার-পাঁচ দিন ধরে এলাকায় অবস্থান করছিলেন। মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে হেফাজতে নেয়। মন্দিরের সভাপতি সমীর কুমার সরকার ও সাধারণ সম্পাদক মিলন কুমার সরকার ওই নারীর মানসিক ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে ইসকন ও স্থানীয়দের বিরোধ গত ১ অক্টোবর সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লী থানার ভাতগাঁও এলাকায় শ্রী শ্রী রসিক রায় জিঁউ ইসকন মন্দিরে প্রতিমা স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিরোধের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল লোক মন্দিরে প্রবেশ করে সেখানে থাকা ইসকনের কয়েকজন সদস্যকে মারধর ও মালামাল ভাঙচুর করে। পরে ইসকন সম্প্রদায়ের আরও লোকজন ঘটনাস্থলে এলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি মনোরঞ্জন সিংহের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ইসকন ও স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিরোধের জের ধরে ঘটে। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে সমঝোতা হয়। নতুন করে তৈরি প্রতিমা স্থাপন করা হয়। এ ঘটনায় ভুল্লী থানায় জিডি করা হয়।
সরকারি অনুদানের টাকা নিয়ে দুই মন্দিরের বিরোধ গত ২ অক্টোবর রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কাশিডাঙ্গী বৈরাগীপাড়ায় কৃষ্ণ মন্দির ও কালী মন্দিরের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, দুই মন্দিরের উন্নয়নের জন্য সরকারি অনুদান চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। কৃষ্ণ মন্দিরের নামে এক লাখ টাকা বরাদ্দের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দুই পক্ষই অর্থটি নিজেদের আবেদনের বিপরীতে বরাদ্দ হয়েছে বলে দাবি করে। এ নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ঘটনায় বালিয়াডাঙ্গী থানায় জিডি করা হয়েছে।
টাঙ্গাইলে প্রতিমা স্থাপনের স্থান নিয়ে সংঘর্ষ গত ৪ অক্টোবর টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার নলখীপাড়া এলাকায় পূর্ণচন্দ্র নাট মন্দিরের অস্থায়ী কমিটির উদ্যোগে দুর্গাপূজা আয়োজনের প্রস্তুতির সময় প্রতিমা মন্দিরের ভেতরে না বাইরে স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। সভাপতি জয়রথ পাল ও সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র পালের পক্ষের লোকজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মারামারি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
দেলদুয়ার উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রঘুনাথ বসাক জানান, পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়। পূজা চলাকালে বিশৃঙ্খলা না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অঙ্গীকার করেন। এ ঘটনায় দেলদুয়ার থানায় জিডি করা হয়।
নিরাপত্তা ও আইনগত ব্যবস্থার দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পূজাকে কেন্দ্র করে প্রকৃত অপরাধের ঘটনাগুলোতেও পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, চোরাই মালামাল উদ্ধারের উদ্যোগ এবং বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রেখেছে। তবে এসব দাবির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, গ্রেপ্তার ও উদ্ধারসংক্রান্ত তথ্য এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সূত্রটির দাবি, সারাদেশে ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং প্রকৃত তথ্য প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।