ঢাকা   ১১:২৩:৫৭ পিএম, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রুচির দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে হবে

Reporter Name
  • Update Time : Thursday, October 22, 2026,
  • 7 Time View
  • ১১ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

বিপ্লব সিকদার : বস্তুগত উন্নতির সঙ্গে রুচি, বিবেক ও মননশীলতার বিকাশ না ঘটলে সমাজের অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সমাজে দুর্ভিক্ষ বলতে আমরা সাধারণত খাদ্যাভাব, দারিদ্র্য কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট বুঝি। কিন্তু এর বাইরেও একটি দুর্ভিক্ষ আছে, যা নীরবে সমাজের ভেতর বিস্তার লাভ করে। তা হলো রুচির দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষে খাদ্যের অভাব হয় না, পোশাকের অভাব হয় না, প্রযুক্তিরও অভাব থাকে না; অভাব দেখা দেয় মননে, বিবেকে, শালীনতায়, মানবিকতায় এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চায়। এই সংকটের লক্ষণ যখন ব্যক্তিজীবন থেকে সামাজিক পরিসর, বিনোদন থেকে রাজনীতি, এমনকি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
রুচি কেবল পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়। রুচি হলো মানুষের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ ও অন্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বিত প্রকাশ। একজন মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে পারে, অর্থবিত্ত থাকতে পারে, সামাজিক পরিচিতিও থাকতে পারে; কিন্তু তার আচরণে যদি শালীনতা না থাকে, কথায় যদি সংযম না থাকে, অন্যের প্রতি যদি ন্যূনতম সম্মানবোধ না থাকে, তবে সেই অর্জন পূর্ণাঙ্গ মনুষ্যত্বের পরিচয় বহন করে না। একইভাবে একটি সমাজের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো, আয় কিংবা প্রযুক্তির পরিমাপে নির্ধারিত হতে পারে না। সেই সমাজ কতটা মানবিক, কতটা সহনশীল এবং কতটা সংস্কৃতিমনস্ক—সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ বহুগুণ বাড়িয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু সেই সুযোগের অপব্যবহারও কম নয়। কাউকে হেয় করা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন মন্তব্য, যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো কিংবা সামান্য জনপ্রিয়তার আশায় অন্যের মর্যাদাহানি করার প্রবণতা উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে যুক্তির চেয়ে গালাগাল, তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা এবং সৃজনশীলতার চেয়ে চটকদার উপস্থাপন বেশি মনোযোগ পায়। তবে সবাই এমন নন, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সমস্যা মাধ্যমটিতে নয়; সমস্যা এর ব্যবহার, সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব এবং জনপ্রিয়তাকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতায়।
বিনোদনের ক্ষেত্রেও রুচির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিনোদন মানুষের মনকে প্রশান্ত করবে, চিন্তার জগৎ প্রসারিত করবে, জীবনের নানা দিক সম্পর্কে উপলব্ধি তৈরি করবে—এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু যখন সস্তা উত্তেজনা, ব্যক্তিগত বিদ্রূপ কিংবা অশালীন উপস্থাপনাকে জনপ্রিয়তার সহজ পথ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন সুস্থ বিনোদনের জায়গাটি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অবশ্য শালীনতার নামে সৃজনশীলতা, ব্যঙ্গ কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করাও কাম্য নয়। সুস্থ রুচি মানে সবকিছুকে এক ছাঁচে ফেলা নয়; বরং স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও রুচি ও শালীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। মতাদর্শের পার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, সরকারের সমালোচনা হবে, বিরোধী পক্ষের বক্তব্যের জবাবও দেওয়া হবে। কিন্তু এসবের ভাষা যদি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, অশ্রাব্য বাক্য কিংবা প্রতিপক্ষকে অসম্মান করার প্রতিযোগিতায় পর্যবসিত হয়, তবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তির জবাব যুক্তিতে, অভিযোগের জবাব তথ্যে এবং মতবিরোধের সমাধান আলোচনার মাধ্যমে হওয়াই সভ্য রাজনৈতিক আচরণের পরিচয়। রাজনৈতিক পরিচয় কখনোই কাউকে শালীনতা ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে তুলে দিতে পারে না।
গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংবাদমাধ্যম শুধু ঘটনা পরিবেশন করে না; তার ভাষা, শিরোনাম ও উপস্থাপনা জনপরিসরের আলোচনার ধরনকেও প্রভাবিত করতে পারে। পাঠক বা দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় অতিরঞ্জিত শিরোনাম, অসমর্থিত অভিযোগ কিংবা ব্যক্তিগত মর্যাদাহানিকর উপস্থাপন পরিহার করা জরুরি। সংবাদ হবে তথ্যনির্ভর, ভাষা হবে সংযত এবং সমালোচনা হবে প্রমাণভিত্তিক। একই সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি সুস্থ গণমাধ্যম জনরুচির অবক্ষয়কে উসকে দেয় না; বরং দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে জনপরিসরকে সমৃদ্ধ করে।
রুচির দুর্ভিক্ষের পেছনে শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা কারণ কাজ করতে পারে। শুধু নীতিকথা বলে কিংবা কাউকে দোষারোপ করে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। শিশু-কিশোরদের ছোটবেলা থেকেই শিষ্টাচার, সহমর্মিতা, যুক্তিবোধ ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা শেখাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, নাটক, বিতর্ক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। পরিবারে সন্তানদের সামনে প্রাপ্তবয়স্কদের আচরণও হতে হবে দায়িত্বশীল। কারণ উপদেশের চেয়ে জীবন্ত উদাহরণ অনেক সময় বেশি কার্যকর।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। তবে রুচি প্রতিষ্ঠার নামে কোনো ধরনের জবরদস্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি অসহিষ্ণুতা তৈরি করা যাবে না। সুস্থ রুচি গড়ে ওঠে শিক্ষা, অনুশীলন, মুক্তচিন্তা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে। মানুষের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখেই সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, রুচির সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে হবে নিজের কাছ থেকেই। আমি কী বলছি, কী লিখছি, কী প্রচার করছি এবং অন্যের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করছি—এই প্রশ্নগুলো প্রত্যেকের নিজের কাছে তোলা প্রয়োজন। অন্যের অশালীনতা নিয়ে সরব হয়ে নিজের আচরণে অসংযমী থাকলে পরিবর্তন আসবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্য, জনসমক্ষে উচ্চারিত একটি বাক্য কিংবা কারও সম্পর্কে ছড়ানো একটি অসমর্থিত তথ্যও মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি আত্মসংযম ও দায়বদ্ধতার চর্চাও জরুরি।
লেখক -সাংবাদিক।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি