ঢাকা   ০৯:৫১:০৬ পিএম, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
প্রধানমন্ত্রী অবৈধ হলে বিরোধী চিফ হুইপ বৈধ কীভাবে সৃজনশীল শিল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: অর্থমন্ত্রী নোট অব ডিসেন্টে পরিবর্তন চাইলে বৈঠকে আসতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের আড়ালে নিঃসঙ্গতার আগুনে পুড়ছে পরিবার এক প্রতিষ্ঠানে একাধিক টেন্ডার নয়, তাঁতিদের স্বার্থরক্ষায় গুরুত্ব প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন গতির আশা টোকিওর সাগরে লঘুচাপ ঘনীভূত, ধেয়ে আসতে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ বাস্তব কাজেই আস্থা অর্জন করতে চায় বিএনপি: মীর শাহে আলম ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৫ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৯৮ ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে ৮ জনের মৃত্যু

প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের আড়ালে নিঃসঙ্গতার আগুনে পুড়ছে পরিবার

Reporter Name
  • Update Time : Saturday, October 24, 2026,
  • 9 Time View
  • ২২ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

বিপ্লব সিকদার : বিদেশের মাটিতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন একজন মানুষ। কখনো মরুভূমির প্রচণ্ড গরমে, কখনো নির্মাণশ্রমিকের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে, কখনো কারখানার দীর্ঘ কর্মঘণ্টায় ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করছেন পরিবারের জন্য। মাস শেষে দেশে পাঠাচ্ছেন টাকা। সেই টাকায় চলছে সংসার, সন্তানের পড়াশোনা, মা-বাবার চিকিৎসা, নির্মিত হচ্ছে স্বপ্নের বাড়ি। আত্মীয়স্বজনের চোখে তিনি সফল প্রবাসী। কিন্তু হাজার মাইল দূরে থাকা মানুষটির কাছে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—যে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের বর্তমানকে বিসর্জন দিলেন, সেই পরিবারে তাঁর অনুপস্থিতির মূল্য কতটা?
বাংলাদেশের অসংখ্য প্রবাসী পরিবারের গল্পে আছে স্বপ্নপূরণের আনন্দ, আবার কোথাও আছে দীর্ঘ অপেক্ষা, অভিমান, মানসিক দূরত্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েন। বাইরে থেকে যে সংসারকে সচ্ছল মনে হয়, ভেতরে সেই সংসারের কোনো কোনো সদস্য হয়তো নিঃসঙ্গতার সঙ্গে লড়ছেন। কোথাও স্ত্রী একা হাতে সন্তান ও সংসার সামলাতে গিয়ে ক্লান্ত, কোথাও প্রবাসী স্বামী বিদেশের কর্মব্যস্ততার মধ্যে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করছেন, কোথাও সন্তান বড় হচ্ছে বাবার সান্নিধ্য ছাড়াই। আবার কোনো কোনো পরিবারে অবিশ্বাস, পারিবারিক বিরোধ কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কের সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে একসময় বিচ্ছেদের কথাও ভাবতে হয়।
এই বাস্তবতার সবটুকু রেমিট্যান্সের হিসাবের মধ্যে ধরা পড়ে না। কারণ টাকা পাঠানোর হিসাব রাখা গেলেও অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস, অনুচ্চারিত অভিমান কিংবা সম্পর্কের ভেতরে জমতে থাকা দূরত্বের হিসাব রাখা কঠিন।
প্রবাসী পরিবারের সংকট নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই একটি অভিযোগ সামনে আসে—স্বামী দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে কোনো কোনো স্ত্রী বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। কোথাও এ নিয়ে পারিবারিক বিরোধ, কোথাও সামাজিক অপবাদ, আবার কোথাও সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এসব ঘটনা কতটা বিস্তৃত, কোন পরিস্থিতিতে এমন সংকট তৈরি হয় এবং কত পরিবার এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা নির্ধারণের মতো হালনাগাদ ও প্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় পরিসংখ্যান সহজলভ্য নয়। ফলে বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে সব প্রবাসীর স্ত্রীকে বিচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি পারিবারিক সংকটের বাস্তবতা উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
প্রশ্নটি তাই শুধু কে ভুল করছেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ বিচ্ছেদের মধ্যে একটি পরিবারকে সুস্থ রাখার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি, সহায়তা ও দায়িত্ববোধ প্রয়োজন?
একটি পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য প্রবাসে যাওয়া মানুষটি হয়তো নিজের অনেক ইচ্ছা বিসর্জন দেন। দেশে থাকা স্ত্রীও অনেক সময় নিজের ব্যক্তিগত জীবন, সময় ও স্বাধীনতার কিছু অংশ বিসর্জন দিয়ে সংসারের দায়িত্ব সামলান। দুজনের ত্যাগের ধরন আলাদা, কিন্তু উভয়ের অবদানই গুরুত্বপূর্ণ। সংকট তৈরি হয় তখন, যখন একজনের ত্যাগ অন্যজনের কাছে অদৃশ্য হয়ে যায়।
প্রবাসী স্বামী মনে করতে পারেন, নিয়মিত টাকা পাঠানোই তাঁর দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। দেশে থাকা স্ত্রী হয়তো মনে করেন, সংসারের খরচ মিটলেও তাঁর মানসিক প্রয়োজন, একাকিত্ব ও দৈনন্দিন সংগ্রামের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। আবার বিদেশে থাকা স্বামীও কর্মক্ষেত্রের চাপ, ঋণ, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং নিঃসঙ্গতার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারেন। তিনি হয়তো পরিবারের কাছে নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারেন না, কারণ তাঁর মনে হয়, এতে দেশে থাকা প্রিয়জনদের দুশ্চিন্তা বাড়বে।
এভাবেই দুই প্রান্তে থাকা দুজন মানুষ কখনো কখনো একই পরিবারের সদস্য হয়েও আলাদা জগতে বসবাস করতে শুরু করেন।
ভিডিও কলে কথা হয়, কিন্তু সব কথা বলা হয় না। সন্তানের পরীক্ষার ফল জানা হয়, বাজারের খরচ নিয়ে আলোচনা হয়, বাড়ি নির্মাণের অগ্রগতি দেখা হয়; কিন্তু স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে প্রশ্ন করেন কি—তুমি কেমন আছ, তোমার দিন কেমন কাটছে, কোন কষ্টটি কাউকে বলতে পারছ না? সম্পর্কের ভেতরে এই প্রশ্নগুলো হারিয়ে গেলে যোগাযোগের প্রযুক্তি থাকলেও আবেগের দূরত্ব কমে না।
দেশে থাকা অনেক নারীকে একসঙ্গে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। সন্তানদের স্কুলে নেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা, সংসারের হিসাব, সামাজিক অনুষ্ঠান, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুর মধ্যে নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বশুরবাড়ি বা অন্য আত্মীয়ের সঙ্গে বিরোধ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা কিংবা সামাজিক চাপ তাঁদের মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। আবার অনেক নারী এসব চ্যালেঞ্জ সামলে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন, সন্তানদের সুন্দরভাবে বড় করছেন এবং স্বামীর সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখছেন। একইভাবে অসংখ্য প্রবাসী স্বামী দূরে থেকেও পরিবারকে সময় দিচ্ছেন, সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন এবং সন্তানদের জীবনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
অর্থাৎ প্রবাসে থাকা নিজেই কোনো পরিবারের ভাঙনের কারণ নয়। বরং দীর্ঘ বিচ্ছেদ কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সম্পর্কের মধ্যে কতটা বিশ্বাস রয়েছে এবং সংকটের সময়ে কতটা সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্কের দুর্বলতা অন্য জটিলতার জন্ম দিতে পারে। দীর্ঘদিনের একাকিত্ব, আবেগগত অবহেলা, পারিবারিক বিরোধ কিংবা নতুন পরিচয়ের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা দাম্পত্য সম্পর্কে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কেউ কেউ সেই পরিস্থিতিতে ভুল সিদ্ধান্ত নেন, যা স্বামী-স্ত্রীর বিশ্বাস নষ্ট করে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে তোলে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্দেহ থাকলেও অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে একজন নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনাও পরিবারকে বিপর্যস্ত করতে পারে।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন। একাকিত্ব ও মানসিক চাপ বাস্তব সমস্যা; কিন্তু এগুলো কারও বিশ্বাসভঙ্গের স্বয়ংক্রিয় অজুহাত নয়। একইভাবে সন্দেহ বা অভিযোগও কাউকে দোষী প্রমাণ করে না। সম্পর্কের সংকটকে নৈতিকতার একমাত্র মাপকাঠিতে বিচার না করে বাস্তব পরিস্থিতি, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং পারস্পরিক দায়িত্বের আলোকে দেখতে হবে।
বাংলাদেশে প্রবাসী পরিবারের সামাজিক প্রভাব নিয়ে গবেষণায়ও দীর্ঘ বিচ্ছেদের নানা দিক উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরণার্থী ও অভিবাসী আন্দোলনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান RMMRU-এর Social Costs of Migration on Left-Behind Migrant Spouse and Children in Bangladesh শীর্ষক গবেষণায় ১২ জেলার ১ হাজার ৭৪১টি পরিবারের ৪ হাজার ৮৮৪ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় একাকিত্ব, বাড়তি পারিবারিক দায়িত্ব, মানসিক চাপ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে বিরোধ এবং সন্তানদের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের বিষয় উঠে আসে। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ট্রিবিউন গবেষণাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
২০২৬ সালে Heliyon সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি অনুসন্ধানমূলক গবেষণায় যশোর ও ফরিদপুরের ১২ জন কিশোর-কিশোরী ও পরিচর্যাকারীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে প্রবাসী বাবার অনুপস্থিতির সঙ্গে কিছু সন্তানের একাকিত্ব ও মানসিক চাপের অভিজ্ঞতা উঠে আসে। নমুনা ছোট হওয়ায় এ গবেষণা বাংলাদেশের সব প্রবাসী পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করে না; তবে শিশুদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
এই গবেষণাগুলো থেকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা যায় না। বরং এগুলো দেখায়, অভিবাসনের অর্থনৈতিক সুফলের পাশাপাশি পরিবারে সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী অনেক সময় শিশুরা। বাবা বিদেশে থাকায় তারা তাঁর সঙ্গে প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারে না। মা সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লে শিশুরাও প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। আবার মা-বাবার মধ্যে বিরোধ, সন্দেহ কিংবা বিচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি হলে তাদের নিরাপত্তাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনো কোনো শিশু নিজের কষ্ট প্রকাশ না করে নীরবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
একটি শিশুর কাছে বাবা-মায়ের সম্পর্ক কেবল দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি তার নিরাপদ পৃথিবীরও অংশ। তাই পারিবারিক বিরোধের সময় সন্তানকে এক পক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো, অন্য অভিভাবককে অপমান করা কিংবা তাকে প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। বাবা বিদেশে থাকলেও সন্তানের পড়াশোনা, অনুভূতি, বন্ধুত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সক্রিয় অংশ নিতে পারেন। নিয়মিত কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে যুক্ত থাকা দূরত্ব কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।
তবে পরিবার রক্ষার দায়িত্ব শুধু স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ওপর ছেড়ে দিলেও চলবে না। দীর্ঘ বিচ্ছেদের আগে পরিবারকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। বিদেশযাত্রার সময় কর্মসংস্থান, চুক্তি ও আর্থিক বিষয় নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দাম্পত্য যোগাযোগ, সন্তানদের দায়িত্ব, মানসিক চাপ মোকাবিলা এবং সংকটের সময়ে সহায়তা নেওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
দেশে থাকা পরিবারের জন্য উপজেলা পর্যায়ে পরামর্শকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলিং, আইনগত সহায়তা এবং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, সমাজসেবা কার্যালয়, অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠন সমন্বিতভাবে এ উদ্যোগ নিতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসীর পরিবারকে ঘিরে গুজব, সামাজিক অপমান ও অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধে সচেতনতা প্রয়োজন।
সম্পর্কে অবিশ্বাস তৈরি হলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত অভিযোগ ও প্রমাণের পার্থক্য বোঝা। নিরাপদ পরিবেশে আলোচনা, প্রয়োজনে নিরপেক্ষ কাউন্সেলরের সহায়তা এবং উভয়ের সম্মতিতে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু নির্যাতন, হুমকি বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে সবার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব না হলে সন্তানদের কল্যাণ, আর্থিক অধিকার ও ব্যক্তিগত মর্যাদা বিবেচনায় নিয়ে আইনসম্মত সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
পরিবার বাঁচানো মানে যেকোনো মূল্যে সম্পর্ক ধরে রাখা নয়। পরিবার বাঁচানো মানে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রত্যেকে সম্মান পাবে, নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারবে এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রবাসীর পাঠানো অর্থ দিয়ে নির্মিত বাড়ির ভেতরে যদি দীর্ঘদিনের অভিমান জমে থাকে, সন্তান যদি বাবার সান্নিধ্যের অভাবে কষ্ট পায়, কিংবা স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তবে সেই উন্নয়নের সামাজিক মূল্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই সমস্যার সমাধানে আরও নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্য দরকার। কত পরিবার দীর্ঘ বিচ্ছেদের কারণে মানসিক চাপ অনুভব করছে, কত পরিবার কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ পাচ্ছে, শিশুদের ওপর কী প্রভাব পড়ছে এবং কোন ধরনের সহায়তা সবচেয়ে কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষণা, সরেজমিন অনুসন্ধান ও প্রবাসী পরিবারের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ জরুরি। একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগকে সামগ্রিক সামাজিক প্রবণতা হিসেবে তুলে ধরার আগে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রবাসীর জীবন শুধু বিদেশের কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; তার একটি অংশ পড়ে থাকে দেশে, পরিবারের প্রতিদিনের জীবনে। সেই পরিবারের মানুষগুলোও শুধু রেমিট্যান্সের সুবিধাভোগী নন, তাঁরা প্রত্যেকে অনুভূতি, প্রত্যাশা ও দায়িত্ব নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ।
একটি সুস্থ পরিবার গড়ে ওঠে না শুধু টাকায়, আবার শুধু উপদেশেও টিকে থাকে না। এর জন্য প্রয়োজন যোগাযোগ, বিশ্বাস, দায়িত্ব ভাগাভাগি, মানসিক সহায়তা এবং একে অপরের প্রতি সম্মান। প্রবাসী স্বামীকে বুঝতে হবে, অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি সম্পর্কের যত্নও জরুরি। দেশে থাকা স্ত্রী বা স্বামীকে বুঝতে হবে, দীর্ঘ বিচ্ছেদে পারস্পরিক আস্থা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। আর সমাজকে বুঝতে হবে, সন্দেহ বা অপমান নয়—সহযোগিতা ও সহমর্মিতাই সংকট মোকাবিলার পথ।
বিদেশের মাটিতে উপার্জিত অর্থ হয়তো একটি পরিবারের বাড়ি তৈরি করে, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু সেই বাড়িকে সত্যিকার অর্থে পরিবার করে রাখার জন্য প্রয়োজন মানুষের উপস্থিতি, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। রেমিট্যান্স সংসারের ব্যয় মেটাতে পারে; সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখতে হলে মানুষকেও মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি