https://bindubanglatv.com/
বিপ্লব সিকদার :
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার মানিকারচর সরকারি ডিগ্রি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে হতাশা দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের পরীক্ষায় কলেজটির ২৫২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ১২৯ জন। পাসের হার ৫১ দশমিক ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তবে ফলাফলের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, অভিভাবকদের অসচেতনতা, বাল্যবিয়ে ও বিদেশমুখী প্রবণতার পাশাপাশি পাঠদান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন।
কলেজের বিভাগভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানবিক বিভাগে ১৫২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৭৪ জন। পাসের হার ৪৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ বিভাগে এক বিষয়ে ফেল করেছেন ৫৩ জন, দুই বিষয়ে ফেল ১৪ জন এবং সম্পূর্ণ অকৃতকার্য হয়েছেন ১১ জন। অর্থাৎ মানবিক বিভাগে ৭৮ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন
শিক্ষার মান ও ফলাফল নিয়ে সচেতন মহলের পর্যবেক্ষণ, শুধু পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো কিংবা সবাইকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়াই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগে শিক্ষার্থীদের পাস করার উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তাঁদের মতে, যেসব শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি দুর্বল, তাদের চিহ্নিত করে বিশেষ ক্লাস, নিয়মিত মূল্যায়ন ও বিষয়ভিত্তিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের পাঠদান কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীর অনিয়মিত উপস্থিতি যেমন ফলাফলে প্রভাব ফেলে, তেমনি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান ও শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ফলাফল বিশ্লেষণে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে মানবিক বিভাগে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১৫২ জনের মধ্যে ৭৮ জন পাস করতে পারেননি। বিজ্ঞান বিভাগেও ২৩ জনের মধ্যে ১৩ জন অকৃতকার্য হয়েছেন। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার তুলনামূলক বেশি হলেও ৩১ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, মানবিক বিভাগে ৫৩ জন এবং বিজ্ঞান বিভাগে ৯ জন শিক্ষার্থী মাত্র একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। তাঁদের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে আগে থেকেই বিশেষ প্রস্তুতির ব্যবস্থা করা গেলে ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব ছিল কি না, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তবে এ ফলাফলের দায় কেবল শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কলেজে নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কত ছিল, বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের অগ্রগতি কেমন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নেরও প্রাতিষ্ঠানিক জবাব প্রয়োজন।
উত্তরণের পথ কোথায়?
শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, মানিকারচর সরকারি ডিগ্রি কলেজের ফলাফলে পরিবর্তন আনতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিভাগ ও বিষয়ভিত্তিক দুর্বল শিক্ষার্থীদের তালিকা করে বিশেষ ক্লাস এবং নিয়মিত পরীক্ষা নিতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের পাঠদান ও উপস্থিতি তদারকির পাশাপাশি শিক্ষার মান মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
এ ছাড়া বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং ছেলেদের অল্প বয়সে বিদেশে পাঠানোর প্রবণতা সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে মানিকারচর সরকারি ডিগ্রি কলেজের ফলাফল শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়; এটি মেঘনার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার বাস্তব অবস্থা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ফলাফল প্রকাশের পর অসন্তোষ প্রকাশেই কি দায়িত্ব শেষ হবে, নাকি আগামী পরীক্ষার আগেই শিক্ষার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হবে?