কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার চন্দনপুর বাজার থেকে মানিকারচর বাজার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের বর্তমান অবস্থা কেবল একটি ভাঙাচোরা রাস্তার গল্প নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন ব্যবস্থার জবাবদিহির একটি কঠিন প্রশ্ন। মাত্র পাঁচ বছর আগে নির্মিত একটি সড়ক যদি আজ খানাখন্দে ভরে যায়, বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকে এবং প্রতিদিন দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে উন্নয়নের সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি ব্যর্থতার কারণও খুঁজতে হবে। জনগণের করের টাকায় নির্মিত অবকাঠামো এত অল্প সময়ে নষ্ট হয়ে গেলে শুধু নতুন করে সংস্কারের অর্থ বরাদ্দ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং জানতে হবে—কোথায় ত্রুটি ছিল, কার অবহেলা ছিল এবং কেন জনগণ বারবার একই সমস্যার শিকার হচ্ছে।বাংলাদেশে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন গত এক দশকে দৃশ্যমানভাবে এগিয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এসব অবকাঠামোর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য তখনই পাওয়া যায়, যখন নির্মিত অবকাঠামো দীর্ঘদিন টেকসই থাকে। পাঁচ বছরও টিকতে না পারা একটি সড়ক উন্নয়নের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি শুধু একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়; এটি পরিকল্পনা, নির্মাণ, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণ—সব পর্যায়ের দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে।
চন্দনপুর-মানিকারচর সড়কটি স্থানীয় মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগী, চাকরিজীবীসহ হাজারো মানুষ চলাচল করেন। স্থানীয় কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই এই সড়কের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। অথচ বর্তমানে সড়কটির এমন অবস্থা হয়েছে যে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা প্রায় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি হলে কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত—তা বোঝার উপায় থাকে না। এতে শুধু যানবাহনের ক্ষতি হয় না, মানুষের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণের সময় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং যথাযথ তদারকির অভাবের কারণেই সড়কটি দ্রুত নষ্ট হয়েছে। অভিযোগ সত্য কি না, সেটি তদন্তের বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাস্তা ভেঙে গেছে—এটি দৃশ্যমান সত্য। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। নির্মাণকাজে অনিয়ম হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে একই ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও চলতেই থাকবে।
বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো সড়ক নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই আবার সংস্কারের প্রয়োজন হয়। এতে একদিকে জনগণ দুর্ভোগে পড়ে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ বারবার একই খাতে ব্যয় করতে হয়। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। একটি সড়ক এমনভাবে নির্মাণ হওয়া উচিত, যাতে নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষতি ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। উন্নয়ন প্রকল্পের লক্ষ্য হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ, স্বল্পমেয়াদি কাজ শেষ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্ষণাবেক্ষণ। অনেক সময় ছোটখাটো ক্ষতি দ্রুত মেরামত করা হলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, গর্ত ছোট থাকতেই মেরামত না করে সেটি বড় হওয়ার অপেক্ষা করা হয়। পরে পুরো সড়ক সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়। এতে সময়ও বেশি লাগে, খরচও বাড়ে এবং জনগণের দুর্ভোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার—সব পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তার গুণগত মান নিশ্চিত করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কোনো প্রকল্পের উদ্বোধনের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। জনগণ সেবা পাচ্ছে কি না, অবকাঠামো টেকসই হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চন্দনপুর-মানিকারচর সড়কের বিষয়ে এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ কারিগরি মূল্যায়ন। প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সড়কের ক্ষতির কারণ নির্ণয় করতে হবে। নির্মাণে ত্রুটি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে সড়কটি টেকসইভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে জনগণ নিরাপদে চলাচল করতে পারেন। শুধু গর্তে ইট বা খোয়া ফেলে সাময়িক সমাধান দিলে কয়েক মাস পর আবার একই সমস্যা ফিরে আসবে।উন্নয়ন মানে শুধু নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানো নয়; উন্নয়ন মানে জনগণের জীবনমানের স্থায়ী উন্নতি নিশ্চিত করা। একটি সড়ক যদি জনগণের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই উন্নয়নের সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জনগণের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা শুধু নিরাপদ, টেকসই ও মানসম্মত একটি সড়ক চান, যাতে প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে চলাচল করতে না হয়।
চন্দনপুর-মানিকারচর সড়ক আজ একটি বড় প্রশ্নের প্রতীক—জনগণের অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর প্রকৃত মালিক কি জনগণ, নাকি দায়িত্বহীনতার একটি চক্র? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে কাজের মাধ্যমে। তদন্ত, জবাবদিহি এবং টেকসই সংস্কারের মধ্য দিয়েই মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অন্যথায় উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্রের আড়ালে জনগণের দুর্ভোগের বাস্তবতা আরও প্রকট হবে।
আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, কার্যকর উদ্যোগ। প্রয়োজন দায় স্বীকারের সংস্কৃতি এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা। চন্দনপুর থেকে মানিকারচর পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়ক হয়তো জাতীয় মহাসড়ক নয়, কিন্তু এই পথের প্রতিটি গর্ত স্থানীয় মানুষের প্রতিদিনের কষ্ট, ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার সাক্ষ্য বহন করে। উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন এমন একটি সড়কও সমান গুরুত্ব পাবে এবং জনগণ নিশ্চিত হবে তাদের করের প্রতিটি টাকা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে।