ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার জগদল ও ধর্মগড় সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে নিহত বাংলাদেশিদের পরিবারের দীর্ঘদিনের দুর্দশার খবর কেউ রাখেনি—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতদের স্বজনরা। তাদের দাবি, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে ধর্মগড় ইউনিয়নের শাহানাবাদ এলাকার বাসিন্দা আইজুল সীমান্ত এলাকায় ঘাস কাটতে গেলে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন বলে স্থানীয়দের দাবি। পরে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাঁর স্ত্রী-সন্তান চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। পরবর্তীতে জীবিকার সন্ধানে তারা ঢাকায় চলে যান বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।
একইভাবে, কলোনীপাড়া এলাকার জিন্নাত নাগর নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে একই সীমান্ত এলাকায় আইজুল, এরশাদসহ আরও কয়েকজন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
সীমান্তে নিহতদের মরদেহ ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন নাগর নদীর নৌকার মাঝি আব্দুর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিজিবির সঙ্গে নদীপথে পারাপারের কাজে যুক্ত রয়েছেন।
আব্দুর রহমান বলেন, “আমি অনেক লাশ বাংলাদেশে নিয়ে এসেছি। সম্প্রতি ফতেপুর এলাকার একটি লাশও নিয়ে আসতে হয়েছে। এসব ঘটনা খুব কষ্ট দেয়, কিন্তু আমাদের কিছুই করার থাকে না।”
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা হারুন অর রশিদ বলেন, “শুধু মরদেহ ফিরিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সীমান্তে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর আর্থিক পুনর্বাসন, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।”
স্থানীয়দের মতে, সীমান্তে প্রতিটি প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্যই গভীর মানবিক বেদনার কারণ। তাই সীমান্তে নিহতদের পরিবারের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে ৫০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আখলাকুর রহমান বলেন, “সীমান্তে কোনো বাংলাদেশি নিহত হলে বিজিবি প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। তবে নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসনের বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।”
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক রফিকুল হক বলেন, “সীমান্তে নিহত ব্যক্তিদের বিষয়ে সরকার-নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী আমাদের অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি দুঃখজনক যে, আমরা এখনো তাদের পাশে দাঁড়াতে পারিনি। এমন কোনো পরিবার থাকলে আমাকে জানাবেন। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”