এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানের বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। পানি সরে যাওয়ার পর কাদামাটি, ময়লা-আবর্জনায় বসতঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক গ্রামীণ ও অভ্যন্তরীণ সড়ক এখনো পানির নিচে থাকায় ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছাতে বিঘ্ন ঘটছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার ১৩ হাজার ৮৬০টি বসতঘর, ৩৭৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৪৫টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ধস, দেয়ালচাপা ও পানিতে ডুবে নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানান, এক সপ্তাহের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসনে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যক্রম চলছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা। বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সেখানে ৪ হাজার ৫১৯টি বসতঘর এবং প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। উপজেলাটিতে ২ হাজার ৪৮০টি বসতঘর, ৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১৮৭ কিলোমিটার সড়ক এবং ৯টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় তিনজন করে মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগরের ২৪টি ওয়ার্ডের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়। এতে ২ হাজার ২৪৬টি বসতঘর, ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ১২৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহানগরে দুইজন এবং সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী ও রাঙ্গুনিয়ায় একজন করে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে উপজেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রধান সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রধান সড়কের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে বিভিন্ন ইউনিয়নের সংযোগ সড়কের অনেকাংশ এতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক এখনো পানির নিচে থাকায় ত্রাণ ও জরুরি সামগ্রী পরিবহনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
মাত্র আট দিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরের ১৯৬ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রাথমিক হিসাবে এসব সড়ক সংস্কারে প্রয়োজন হবে ৩৪৭ কোটি ৮২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরে জরুরি প্যাচওয়ার্কের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ২২ কোটি টাকা।
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, টানা বর্ষণ ও রেকর্ড বৃষ্টিপাতে বিপুলসংখ্যক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব খাত থেকে প্যাচওয়ার্কের মাধ্যমে জরুরি সংস্কার শুরু করা হবে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের কাছেও বিশেষ বরাদ্দ চাওয়া হবে।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল বলেন, প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা। যেখানে বড় গর্ত হয়েছে, সেখানে অস্থায়ীভাবে ইট ফেলে চলাচলের উপযোগী করা হবে। রাস্তা শুকিয়ে এলে প্যাচওয়ার্ক শুরু হবে।
চসিকের প্রকৌশল বিভাগের জরিপ অনুযায়ী, ৪ নম্বর জোনে সবচেয়ে বেশি ৬৭ দশমিক ৮২ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর ১ নম্বর জোনে ২৮ দশমিক ৬২ কিলোমিটার, ৬ নম্বর জোনে ২৬ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার, ২ নম্বর জোনে ২৬ কিলোমিটার, ৩ নম্বর জোনে ২৪ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার এবং ৫ নম্বর জোনে ২৩ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডের ৩১টি সড়কের মোট ৩৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার অংশ নষ্ট হয়েছে। এসব সড়ক সংস্কারে প্রয়োজন হবে প্রায় ৪৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। দক্ষিণ কাট্টলী ও দক্ষিণ আগ্রাবাদেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
চসিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বর্ষায় ১৪২ দশমিক ২৮১ কিলোমিটার, ২০২৪ সালে ৪২ কিলোমিটার, ২০২৩ সালে ৫০ দশমিক ৭১ কিলোমিটার, ২০২২ সালে প্রায় ১০০ কিলোমিটার, ২০২১ সালে ৩৬ দশমিক ২৭ কিলোমিটার এবং ২০২০ সালে ১৭০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবার মাত্র আট দিনের বর্ষণেই ১৯৬ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গত ছয় বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
চসিক সূত্র জানায়, নগরে মোট ৩ হাজার ৪৫৯টি সড়কের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৪২ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৬ কিলোমিটার অ্যাসফল্ট, ৩৬৪ কিলোমিটার কংক্রিট, ১৫ কিলোমিটার ব্রিক সলিং এবং ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে। তবে চলতি বর্ষণে বিপুলসংখ্যক অ্যাসফল্ট সড়ক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।