https://bindubanglatv.com/
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে জীবন দিয়ে দেশের ক্রান্তিলগ্নে একজন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব যে কত বেশি, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন সিলেটে ইতিহাস সৃষ্টিকারী পুলিশের গুলিতে নিহত সাংবাদিক এটিএম তুরাব।
তরুণ সাংবাদিক, দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদের তৎকালীন রিপোর্টার এটিএম তুরাবের স্মৃতি রক্ষার্থে সিলেট প্রেসক্লাব প্রবর্তিত ‘সাংবাদিক এটিএম তুরাব স্মৃতি পদক’-এ ভূষিত হয়েছেন সিলেটের সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান আবদুল কাদের তাপাদার। তিনি একসময় দৈনিক জালালাবাদের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। যার কারণে বিভাগজুড়ে তৃণমূলের সাংবাদিকদের সঙ্গেও রয়েছে তাঁর গভীর সম্পর্ক ও ভালোবাসা।
দৈনিক নয়া দিগন্তে তথ্যভিত্তিক সংবাদ উপস্থাপন করে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরায় আবদুল কাদের তাপাদারের বেশ কয়েকটি সংবাদ ইতিপূর্বে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে।
তিনি শুধুই একজন সিনিয়র সাংবাদিক নন, একজন ক্লিন ইমেজের মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবেও ব্যাপক পরিচিত। পদকপ্রাপ্ত সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার সিলেটে সাড়ে তিন দশক ধরে বিভিন্ন সাড়া জাগানো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারণে আলোচিত। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারণে তিনি বহুবার মামলার আসামিও হয়েছেন।
শনিবার বিকেলে সিলেট প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় পদক ও সম্মাননার অর্থ পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিকের হাতে তুলে দেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসাইন চৌধুরী এবং সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন।
পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত সাংবাদিক এটিএম তুরাবের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এ আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়।
অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তব্য দেন এটিএম তুরাব স্মৃতি পদকপ্রাপ্ত দৈনিক নয়া দিগন্তের ব্যুরো প্রধান আবদুল কাদের তাপাদার। তিনি বলেন, সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তুরাব হত্যার ঘটনা ন্যাক্কারজনক।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদ এটিএম তুরাব আমাদের সকলের প্রেরণার উৎস। এ হত্যার সঙ্গে জড়িত সকলকে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার বিষয়ে আলোকপাত করে তিনি বলেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তুরাব শহীদ হয়েছেন। গত ১৫ বছর অপতথ্যের মাধ্যমে দেশকে তথ্যসন্ত্রাসে পরিণত করা হয়েছিল। বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দাফন হয়ে গেছে। বিগত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে মিডিয়া স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কলম ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভেদাভেদ থাকতে পারে। কিন্তু দেশের ব্যাপারে আমাদের সকলকে এক থাকতে হবে। দেশপ্রেমের চেতনা নিয়ে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান তিনি।
এমপি এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, তুরাবের লাশ ছিনিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টার সাক্ষী আমরা। মামলায় আমাদের লোকজনকেও আসামি করা হয়। এটা হচ্ছে নির্মম বাস্তবতা। জুলাই বিপ্লবে তুরাব ও গোলাপগঞ্জের সাতজন নিরীহ মানুষকে হত্যার অগ্রগতি নিয়ে তিনি সম্প্রতি চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারে বিলম্বে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা প্রতিশোধপরায়ণ হতে চাই না। এ হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে—এটাই প্রত্যাশা।
সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, তুরাব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রক্রিয়া সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো হয়ে যায় কি না—সে আশঙ্কা রয়েছে।
মহানগর জামায়াতের আমির ফখরুল ইসলাম এ মামলার তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, এ সরকার কোনো অন্যায়কে ছাড় দেবে না।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন বলেন, রাজনীতির কারণে কারও রক্ত ঝরুক—এটা আমরা চাই না।
এ সময় বক্তব্য রাখেন ক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী ও ইকরামুল কবির, সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ হান্নান, সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বদর, সাবেক কোষাধ্যক্ষ কবীর আহমদ সোহেল, ক্লাবের সহ-সাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ এবং ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন। শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ক্লাবের সদস্য কবির আহমদ।
পরে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদারের হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননা তুলে দেন প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ।
ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদক শেখ আশরাফুল আলম নাসির, পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুহিবুর রহমান এবং কার্যনির্বাহী সদস্য আমজাদ হোসাইন ও আনাস হাবিব কলিন্স।
সভাপতির বক্তব্যে সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূর বলেন, একটি পক্ষ এই হত্যা মামলার আসামিদের রক্ষার জন্য শুরু থেকেই তৎপর ছিল। তুরাবের পরিবার যেন ইনসাফ পায়—সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
১৯ জুলাই, শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে সিলেটে মিছিল বের করে বিএনপি ও সমমনা কয়েকটি দল। মিছিলে কোনো উত্তেজনা ছিল না। পরিস্থিতি ছিল শান্ত ও স্বাভাবিক। নিত্যদিনের মতো সাংবাদিকরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নগরের প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজার এলাকা অতিক্রম করছিল বিশাল মিছিল। পাশেই ছিল পুলিশের সশস্ত্র অবস্থান। হঠাৎই এসএমপির তৎকালীন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও ডিসি আজহাবার আলী শেখের মারমুখী আচরণে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। উতপ্ত হয়ে ওঠে সিলেটের বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট এলাকা। তখন পুলিশের কিলিং মিশনের টার্গেটে পড়ে যান সাংবাদিক এটিএম তুরাব।
তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম জানান, তুরাবের শরীরে ৯৮টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলিতে তাঁর লিভার ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায়ও মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল। তুরাব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেদিন সিলেটসহ পুরো বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে অনেক মানুষ আহত হন।