• মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৫ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
মেসির চোখের জল দেখে আবেগী শশী, বললেন ‘দয়া করে কেঁদো না’ সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন রাশেদ সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে সরকার: তথ্য উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে নেতাদের জন্য যা যা ছিল ৩৯ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের ইতি, অবসরে গেলেন শিক্ষাগুরু কুহিনূর আক্তার মুন্সী যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানালেন তারেক রহমান মামলাজট নিরসনে মধ্যস্থতা দিচ্ছে ইতিবাচক ফল: আইনমন্ত্রী ভাইরাল ভিডিও ঘিরে শেহনাজকে নিয়ে প্রেমের গুঞ্জন জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছে কওমি দলগুলো? সরকারিভাবে হজে যেতে থাকছে দুই প্যাকেজের সুযোগ

ডেমরার খাল পরিস্কার – পুনরুদ্ধার এখনই সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

বিপ্লব সিকদার / ১৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

 

ঢাকা এমন একটি মহানগর, যার জীবনপ্রবাহের সঙ্গে নদী ও খালের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একসময় রাজধানীর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য খাল শুধু পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমই ছিল না, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বৃষ্টির পানি ধারণ, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, অবৈধ দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় এসব খালের অধিকাংশই আজ অস্তিত্ব সংকটে। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ডেমরা এর ব্যতিক্রম নয়। ডেমরা থানা এলাকার বিভিন্ন খাল আজ দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, জনদুর্ভোগ বাড়ছে এবং পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। তাই ডেমরার খাল পুনরুদ্ধার ও পরিষ্কারে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
ডেমরা দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। আবাসিক ভবন, শিল্পকারখানা, গুদাম, বাজার এবং ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে খালগুলোও সংকুচিত হতে থাকে। কোথাও খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও আবার ময়লা-আবর্জনা ও নির্মাণবর্জ্য ফেলে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য এবং গৃহস্থালির বর্জ্য সরাসরি খালে পড়ায় পানি কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে খালের অস্তিত্বই চোখে পড়ে না।
বিশেষজ্ঞরা বহুবার বলেছেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হলো প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়া। অতিবৃষ্টি হলে পানি দ্রুত নদীতে চলে যাওয়ার কথা থাকলেও খালগুলো ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ায় সেই সুযোগ আর থাকে না। ফলে পানি দিনের পর দিন রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমে থাকে। ডেমরার বহু এলাকায় বর্ষাকালে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রোগব্যাধির প্রকোপ বেড়ে যায়।
খালের দূষণের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। দূষিত পানিতে মশার বংশবিস্তার বেড়ে যায়। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। দুর্গন্ধের কারণে আশপাশের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলার ফলে খালের পানি শুধু পরিবেশ নয়, ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন খাল উদ্ধার ও পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন সংস্থা খাল পুনর্খনন, দখল উচ্ছেদ এবং অবৈধ স্থাপনা অপসারণের কাজও করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পর আবার অনেক খাল দখল হয়ে যায়। এর প্রধান কারণ হলো নিয়মিত নজরদারির অভাব, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের ঘাটতি। ডেমরার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়।
একটি খাল পরিষ্কার করা মানেই কেবল ময়লা অপসারণ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। প্রথমে খালের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর সব ধরনের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খালকে তার স্বাভাবিক প্রস্থ ফিরিয়ে দিতে হবে। নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পলি অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে কেউ ভবিষ্যতে আবার খাল দখল বা ভরাট করতে না পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন বা বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে কিংবা অসচেতনতার কারণে খালে ময়লা ফেলে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন করার জন্য ধারাবাহিক প্রচারণা চালাতে হবে। কারণ শুধু সরকারি উদ্যোগ দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; জনগণের অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অতীতে দেখা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে খালের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে পুনরুদ্ধারের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। যে-ই দখল করুক, তার বিরুদ্ধে একইভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং ভবিষ্যতে কেউ সহজে খাল দখলের সাহস পাবে না।
ডেমরার খালগুলোকে শুধু পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে নয়, পরিবেশগত সম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। উন্নত বিশ্বের অনেক শহরে খালকে ঘিরে হাঁটার পথ, সবুজায়ন, উন্মুক্ত স্থান এবং বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এতে একদিকে পরিবেশের উন্নতি হয়েছে, অন্যদিকে মানুষের জীবনমানও বেড়েছে। পরিকল্পিতভাবে ডেমরার খালগুলোকেও এমনভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব।
এক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো উচিত। ড্রোন জরিপ, জিআইএস ম্যাপিং এবং ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে খালের সীমানা সংরক্ষণ ও দখল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ জানানোর জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে। এতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
স্থানীয় জনগণ, পরিবেশবাদী সংগঠন, সাংবাদিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এই আন্দোলনের অংশীদার করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সচেতনতামূলক সভা এবং পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে খাল রক্ষার মানসিকতা তৈরি হবে। গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সচেতনতামূলক প্রচার এবং অনিয়ম তুলে ধরার মাধ্যমে গণমাধ্যম সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে রাজধানীর খালগুলো রক্ষা করা শুধু উন্নয়নের বিষয় নয়, এটি একটি পরিবেশগত নিরাপত্তার প্রশ্ন। অতি বৃষ্টি, আকস্মিক জলাবদ্ধতা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ব্যবস্থা সচল রাখা অপরিহার্য। খালগুলো সচল থাকলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হবে, জলাবদ্ধতা কমবে এবং নগর পরিবেশ তুলনামূলকভাবে বাসযোগ্য হবে।
ডেমরার খাল পুনরুদ্ধারের বিষয়টি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এতে পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজউক, জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করলে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব।
আজ যদি ডেমরার খালগুলোকে বাঁচানো না যায়, তাহলে আগামী দিনে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের সংকট আরও তীব্র হবে। অন্যদিকে এখনই সাহসী ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে ডেমরাকে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য এলাকায় রূপান্তর করা সম্ভব। তাই ডেমরার খাল পুনরুদ্ধারকে আর কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দখলমুক্তকরণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের সমন্বয়েই কেবল এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। ডেমরার মানুষ একটি পরিচ্ছন্ন ও সচল খালব্যবস্থার অধিকার রাখে। সেই অধিকার বাস্তবায়নে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে একটি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ভবিষ্যৎমুখী রাজধানী গড়ার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

লেখক -সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন