ঢাকা   ১০:৩৫:০৭ পিএম, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বর্ষার টানে চলনবিলে উপচে পড়া ভিড়, প্রাণ ফিরে পেয়েছে সিংড়া নৌকা ঘাট

Reporter Name
  • Update Time : Tuesday, July 28, 2026,
  • 92 Time View
  • ৭ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

মোঃ ইব্রাহিম আলী:

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি চলনবিল। দেশের বৃহত্তম এই বিল এখন বর্ষার পানিতে থৈথৈ করছে। দিগন্তজোড়া জলরাশি, মৃদু বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ আর নীল আকাশের হাতছানিতে যেন নতুন রূপে সেজেছে চলনবিল। আর এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে নাটোরের সিংড়ায় প্রতিদিনই ভিড় করছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা। উপজেলা সদর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিংড়া পেট্রোবাংলা পয়েন্ট নৌকা ঘাট এখন পরিণত হয়েছে ভ্রমণপিপাসুদের প্রাণকেন্দ্রে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সূর্য ওঠার পর থেকেই জমজমাট হয়ে ওঠে নৌকা ঘাটটি। রাজশাহী, বগুড়া, পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পরিবার, বন্ধুদের দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যরা প্রথমে সিংড়া পয়েন্টে জড়ো হন। পরে পছন্দমতো নৌকা ভাড়া করে তারা ভেসে পড়েন চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে। ভ্রমণ করেন বিলসা, কুন্দইল ব্রিজ, বিশ্বরোডের ৯ নম্বর ব্রিজ এবং ঐতিহাসিক তিশিখালী মাজারসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে।

বর্তমানে ঘাটে শতাধিক ইঞ্জিনচালিত শ্যালো নৌকা, ছোট ডিঙি নৌকা এবং পিকনিকের জন্য বিশেষভাবে সাজানো বড় নৌকা প্রস্তুত রয়েছে। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য তিশিখালী মাজারে জনপ্রতি ভাড়া ৩০ টাকা। পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে রিজার্ভ নৌকায় যাওয়া-আসার ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা। এছাড়া দিনব্যাপী পিকনিক বা দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য বড় নৌকা ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা এবং মাঝারি আকারের নৌকা ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকায় ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ঘণ্টাভিত্তিক ছোট নৌকার চাহিদাও রয়েছে বেশ।

বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে পর্যটকদের ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ সময় নৌকার ভাড়াও কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃতিপ্রেমীদের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়ে না।

রাজশাহী থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান বলেন, কাজের ব্যস্ততায় শহরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থাকতে হয়। বর্ষায় চলনবিলের উন্মুক্ত প্রকৃতি আর শীতল বাতাস সব ক্লান্তি দূর করে দেয়। পরিবার নিয়ে এসে খুব সহজেই মনের মতো নৌকা পেয়েছি।

পর্যটকদের এই ঢলে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় মাঝিরাও। বছরের অন্য সময় তুলনামূলক অলসতা থাকলেও বর্ষা মৌসুমেই তাদের আয়-রোজগারের প্রধান সময়।

পাশের কয়রাবাড়ী গ্রামের নৌকার মাঝি সুজন আলী বলেন, বর্ষা এলেই আমাদের কপাল খোলে। প্রতিদিন শত শত মানুষ বিল দেখতে আসে। শুক্র ও শনিবার ভিড় আরও বেশি হয়। আয়-রোজগারও ভালো হয়। আমরা চেষ্টা করি সবাইকে নিরাপদে ঘুরিয়ে দেখাতে।

পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে ঘাটসংলগ্ন দোকানপাটেও এখন বেচাকেনার ধুম পড়েছে। চটপটি, ফুচকা, ঝালমুড়ি, টক-মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে চায়ের স্টল, গামছা, পোশাক ও স্যান্ডেলের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ঘাট এলাকার কফিহাউসের স্বত্বাধিকারী মোঃ আব্দুল আল মামুন বলেন, পর্যটক বাড়ায় আমাদের দোকানে বিক্রি অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ফুচকা আর চায়ের দোকানে সারাদিনই ভিড় থাকে। বিলের হাওয়া খেতে এসে মানুষ কেনাকাটাও করছেন বেশ।

কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের জানান, গামছার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি হাফ প্যান্ট, কোয়ার্টার প্যান্ট এবং অনটাইম স্যান্ডেলের বিক্রিও বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, ধীরে ধীরে এই নৌকা ঘাট মিনি কক্সবাজারে পরিণত হচ্ছে।

বর্ষার মোহনীয় সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ জলরাশি আর প্রাণবন্ত পরিবেশের কারণে চলনবিলের সিংড়া পেট্রোবাংলা পয়েন্ট নৌকা ঘাট এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতির রূপ আর মানুষের আনন্দের মিলনে বর্ষাকালে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে চলনবিল।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি