মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ কম গ্যাস পাচ্ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম।
গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত এক সপ্তাহ ধরে নগরীর অধিকাংশ বাসাবাড়িতে রান্নার চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে দিনের বেশিরভাগ সময় চুলা জ্বলছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় এক সপ্তাহ আগে মহেশখালীর এঙিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর টার্মিনালটির কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতে প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনার প্রক্রিয়াও চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একটি বয়লার চালু করা সম্ভব হলে আগামী ১ আগস্টের পর দৈনিক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধারের আশা করা হচ্ছে। তবে পুরো টার্মিনাল স্বাভাবিকভাবে চালু হতে ১১ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এর বড় প্রভাব পড়েছে এলএনজিনির্ভর চট্টগ্রাম অঞ্চলে।
চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম ছিল। স্বাভাবিক সময়েও দৈনিক ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। সংকট শুরুর আগে সরবরাহ নেমে এসেছিল প্রায় ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুটে। বর্তমানে তা আরও কমিয়ে ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামানো হয়েছে।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত। রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) বন্ধ রয়েছে। কেবল কাফকোতে সীমিত পরিসরে সার উৎপাদন চলছে বলে জানা গেছে।
গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালানো হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহে। ফলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ ও সার খাতে গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার পর অবশিষ্ট প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে শিল্প, বাণিজ্যিক, আবাসিক ও সিএনজি খাতের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে পুরো নেটওয়ার্কে প্রয়োজনীয় চাপ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কমে গেছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় নগরীর বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস নিতে পারছেন না।
দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে ভোগান্তি বাড়ছে। এদিকে সংকটকে পুঁজি করে কিছু সিএনজিচালিত ট্যাক্সিচালক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে স্টিল, রি-রোলিং, কাচ, সিরামিক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন সময় কমিয়ে আনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের পাশাপাশি গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় একটি সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।
অনেক পরিবারকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়ও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
কেজিডিসিএলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জাতীয় চাহিদার কারণে অন্য অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হলে চট্টগ্রামে সরবরাহ আরও কমিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই টার্মিনালটি দ্রুত সচল করাই বর্তমান সংকট নিরসনের অন্যতম প্রধান উপায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বয়লার চালু করা গেলে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে পুরো টার্মিনাল স্বাভাবিকভাবে চালু না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
এদিকে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার কথাও জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া এলএনজি সরবরাহ, কারিগরি সহযোগিতা কিংবা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। দেশটির আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসিক খাতে সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত এলএনজি টার্মিনালের মেরামত শেষ করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের মানুষ ও নগরবাসী।