• মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৩০ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
মেঘনা-কাঠালিয়া নদীর সীমানা নির্ধারণে দ্রুত জোর দাবি দুদকের নতুন চেয়ারম্যানসহ দুই কমিশনার নিয়োগ নোবিপ্রবি অর্থনীতি বিভাগের ৯ম ব্যাচের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত মেঘনার মুগার চরে মাদকবিরোধী র‍্যালি শিক্ষার্থী লাঞ্ছনার অভিযোগে যশোর শিক্ষা বোর্ড সচিবের অপসারণ দাবিতে বিক্ষোভ নগরকান্দায় বিএনপির দুই নেতার বিরুদ্ধে ফেক আইডিতে অপপ্রচারের অভিযোগ উখিয়ায় বিজিবির অভিযানে ২ লাখ ইয়াবা উদ্ধার, চোরাকারবারি জয়নাল অধরা ফরিদপুরে ৫ পিস ইয়াবাসহ নারী গ্রেপ্তার, আদালতে এক বছরের কারাদণ্ড কোদালিয়া শহীদনগর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা ঘোষণা শামীম মুন্সীর অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে নোবিপ্রবি উপাচার্যের সৌজন্য সাক্ষাৎ

মেঘনা-কাঠালিয়া নদীর সীমানা নির্ধারণে দ্রুত জোর দাবি

আঞ্চলিক প্রতিনিধি / ২ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা ও কাঠালিয়া নদীর কুমিল্লা অংশে সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে নদী ও নদীর চরাঞ্চল দখলমুক্ত করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর সীমানা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না থাকায় একদিকে নদীর জায়গা দখলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে চর ও তীরবর্তী জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নদী ও চর দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও এ সমস্যার ভয়াবহতা সামনে এনেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাঠালিয়া নদীর বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে বাঁশ, গাছের ডালপালা ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে মাছ ধরার অবৈধ ফাঁদ বা ‘ঝোপ’ বসানোর অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে নদীটির মেঘনা অংশে দুই শতাধিক অবৈধ ঝোপ থাকার কথা উঠে আসে। এতে নৌযান চলাচল ও স্বাভাবিক মাছ শিকার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নদীর প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ করা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নদীর সীমানা নিয়ে বিরোধ এখন শুধু জমি বা দখলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; তা স্থানীয় বিরোধ ও সংঘর্ষেরও কারণ হয়ে উঠছে। চলতি বছরের ১৫ জুন মেঘনা ও তিতাস উপজেলার সীমান্তবর্তী একটি চর দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
এর কয়েক সপ্তাহ পর কাঠালিয়া নদীর দক্ষিণ পাড়ের একটি চর দখলকে কেন্দ্র করে তিন গ্রামের মানুষের সংঘর্ষে একজন নারী নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার ঘটনাও প্রকাশ্যে আসে। পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চরবিনোদপুর, আলীপুর ও নতুন ভাটেরারচরের লোকজনের মধ্যে ওই বিরোধ আগে থেকেই চলছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর তলদেশ, তীর ও জেগে ওঠা চর—কোন অংশটি নদীর মূল সীমানার অন্তর্ভুক্ত এবং কোন অংশটি ব্যক্তি বা সরকারি মালিকানাধীন ভূমি—এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে স্পষ্টতা না থাকলে দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, নতুন চর জাগা এবং পুরোনো নদীভূমি ভরাট বা দখলের ফলে কয়েক দশকের ব্যবধানে বাস্তব চিত্র বদলে যেতে পারে। ফলে শুধু স্থানীয় মানুষের দাবি বা বর্তমান দৃশ্যমান অবস্থার ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণ না করে সরকারি রেকর্ড, নকশা ও মাঠ জরিপের সমন্বিত যাচাই প্রয়োজন।বাংলাদেশের নদ-নদীর ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেঘনা দেশের অন্যতম প্রধান নদী এবং এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার মধ্যে কাঠালিয়াও উল্লেখযোগ্য। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মেঘনা থেকে তিতাস, পাগলী, কাঠালিয়া, ধনাগোদা ও মতলবসহ বিভিন্ন শাখা বের হয়েছে।
কুমিল্লার নদ-নদী নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দীর্ঘদিনের দখল ও অব্যবস্থাপনার চিত্রও উঠে এসেছে। কুমিল্লার একাধিক নদীর মধ্যে কাঠালিয়ার নামও নদী-দখল ও অস্তিত্ব সংকটের তালিকায় এসেছে।
মেঘনা নদীর চরাঞ্চল নিয়েও অতীতে দখলকে কেন্দ্র করে বিস্তর বিরোধের কথা সংবাদে এসেছে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, নদীর চর দখলের ক্ষেত্রে আন্তঃএলাকা বা সীমানা বিরোধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকলে চর দখল সহজ হয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে মেঘনা–কাঠালিয়া নদীর কুমিল্লা অংশে একটি সমন্বিত জরিপের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভূমি প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, নৌ-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। পুরোনো রেকর্ড, মৌজা ম্যাপ, সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই করে নদীর সীমানা মাঠে চিহ্নিত করা জরুরি।
এরপর নদীর সীমানা দৃশ্যমান করতে প্রয়োজনীয় স্থানে সীমানা পিলার স্থাপন করা যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা, বাঁশের বেড়া, মাছ ধরার ঝোপ, মাটি ফেলে ভরাট কিংবা চরকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী রক্ষার ক্ষেত্রে শুধু দখল উচ্ছেদ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। উচ্ছেদের পর পুনর্দখল ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি, সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের অবস্থার সমন্বয় জরুরি। অন্যথায় এক দফা উচ্ছেদের পর আবারও একই জায়গায় দখল ফিরে আসতে পারে।
মেঘনা–কাঠালিয়ার মতো নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদে এর প্রভাব আরও ব্যাপক। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন, নৌযান চলাচল ও মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে নদীর চর দখল নিয়ে স্থানীয় বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলোর ঘটনাই তার বাস্তব উদাহরণ।
এ অবস্থায় প্রথম কাজ হওয়া উচিত নদীর কুমিল্লা অংশের পূর্ণাঙ্গ সীমানা নির্ধারণ। এরপর সীমানার ভেতরে থাকা অবৈধ স্থাপনা, দখল, বাঁশের ঝোপ ও নদীর প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী সব কার্যক্রমের তালিকা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ করা। একই সঙ্গে নদীর তীর ও চরাঞ্চলে নতুন করে দখল ঠেকাতে প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করতে হবে।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি আর শুধু নদী রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি ভূমি বিরোধ, আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ, নৌপথ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই মেঘনা–কাঠালিয়া নদীর কুমিল্লা অংশকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত যৌথ জরিপ পরিচালনা, সরকারি সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।মেঘনা ও কাঠালিয়ার বুক দখলমুক্ত রাখতে হলে নদীকে কাগজে নয়, মাঠে চিহ্নিত করতে হবে। সরকারি নকশা ও রেকর্ডের সঙ্গে বাস্তব অবস্থার মিল ঘটিয়ে স্থায়ী সীমানা নির্ধারণ করা গেলে একদিকে দখলের সুযোগ কমবে, অন্যদিকে চর দখলকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের সংঘাতও অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন