• সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৪ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
স্পিকারের সঙ্গে আইপিইউ মহাসচিবের সৌজন্য সাক্ষাৎ হামের উপসর্গে প্রাণ গেল আরও ৬ শিশুর আইপিইউ প্রতিনিধির কাছে আওয়ামী লীগকে ‘মাইনাস’ করার অভিযোগ লাশ আর ইয়াবার গন্ধে মাতাল মেঘনাবাসী আওয়ামী আমলে জামায়াত কখনো সংসদ ভবনের আশপাশে গেছে? প্রশ্ন রাশেদ খানের ওমরা থেকে ফিরে বিএনপির বিরুদ্ধে আসিফ মাহমুদের বিস্ফোরক অভিযোগ স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা পেতে ঘুষ দাবি, ক্ষোভে শাহেদের দুই ঘণ্টায় ‘ঘুষ সাইট’ তৈরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর মালয়েশিয়াগামী ১০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীকে বিনা খরচে পাঠানোর নির্দেশ

লাশ আর ইয়াবার গন্ধে মাতাল মেঘনাবাসী

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ৮ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লব সিকদার:

অভিযান আছে, র‍্যালি আছে, সভা আছে—তবু প্রশ্ন, নিরাপদ মেঘনা কোথায়?

মেঘনা—নদী, চর আর প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা একটি জনপদ। একসময় এই এলাকার পরিচয় ছিল নদীর শান্ত স্রোত, কৃষকের ঘাম, জেলের জাল আর সাধারণ মানুষের সহজ-সরল জীবন। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে মেঘনার সামাজিক বাস্তবতাও।

এখন কোনো না কোনো মৃত্যুর খবর, দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ, অস্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা অপরাধের ঘটনায় প্রায়ই আলোচনায় আসে এই জনপদ। অন্যদিকে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের বিস্তার নিয়ে মানুষের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।

ফলে সাধারণ মানুষের মনে এখন একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—মেঘনা আসলে কোন পথে যাচ্ছে?

রূপক অর্থে আজ বলতে হয়, লাশ আর ইয়াবার গন্ধে যেন মাতাল হয়ে উঠছে মেঘনাবাসী।

এটি কোনো আনন্দের মাতলামি নয়। এটি ভয়, হতাশা, অসহায়ত্ব আর নীরবতার এক ভয়ংকর বাস্তবতা।

লাশের খবর কি এখন স্বাভাবিক?

একটি জনপদে যখন ঘন ঘন মৃত্যুর খবর আসে, তখন মানুষের ভেতরে ভয় তৈরি হয়। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর হলো—মানুষ যখন মৃত্যুর খবরের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

আজ কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু।

কাল সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি।

পরদিন নদীতে ডুবে মৃত্যু।

আবার কোথাও সংঘর্ষ, কোথাও পারিবারিক কলহ, কোথাও অপরাধকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো ঘটনা।

কয়েক দিন আলোচনা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হয়। মানুষ মন্তব্য করে। তারপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে চাপা দিয়ে দেয়।

আমরা ভুলে যাই—প্রতিটি লাশের পেছনে একটি পরিবার আছে।

একটি মায়ের বুকফাটা কান্না আছে।

একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ আছে।

একটি পরিবারের স্বপ্ন আছে।

কিন্তু আমাদের সমাজে যেন মৃত্যুও এখন ‘কনটেন্ট’। ছবি আছে, পোস্ট আছে, মন্তব্য আছে—কিন্তু ঘটনার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা কতটুকু?

একটি মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান, অপরাধ থাকলে অপরাধী শনাক্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা—এসবের প্রতি সামাজিক চাপ তৈরি না হলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।

ইয়াবা—নীরব কিন্তু ভয়ংকর ঘাতক

মেঘনায় মাদকের সমস্যা নতুন নয়। তবে ইয়াবার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ এখন অনেক বেশি।

বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ইয়াবাসহ ব্যক্তি গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়। অভিযান হয়, মামলা হয়, গ্রেপ্তারও হয়।

কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থেকেই যায়—

মাদক বন্ধ হচ্ছে কোথায়?

একজন ধরা পড়ছে, আরেকজন তৈরি হচ্ছে।

ছোট কারবারি ধরা পড়ছে, কিন্তু মাদকের মূল উৎস কোথায়?

কারা এই ব্যবসার পেছনে অর্থ দিচ্ছে?

কারা নিরাপদে থেকে এই ভয়ংকর ব্যবসা পরিচালনা করছে?

সাধারণ মানুষের কাছে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।

ইয়াবা শুধু একজন মানুষকে নষ্ট করে না। এটি একটি পরিবারকে ধ্বংস করে। একজন মাদকাসক্ত যুবক প্রথমে নিজের জীবন নষ্ট করে, এরপর পরিবারকে অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে ফেলে।

মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কেউ চুরি করে।

কেউ প্রতারণা করে।

কেউ ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

কেউ আবার আরও ভয়ংকর অপরাধের দিকে চলে যায়।

অর্থাৎ মাদক শুধু একটি সমস্যা নয়—এটি অনেক অপরাধের জন্মদাতা।

অভিযান করতে করতে মাথার ঘাম পায়ে পড়ে, কিন্তু মূল আসামি কোথায়?

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। পুলিশ অভিযান করবে, অপরাধী ধরবে, মাদক উদ্ধার করবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা।

পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। রাতের পর রাত দায়িত্ব পালন করেন। দুর্গম এলাকায় যান। নদীপথে চলাচল করেন। ঝুঁকি নেন।

কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিযোগ ও প্রশ্নও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

অভিযান এত হচ্ছে, তবু মূল আসামিরা কোথায়?

আসামি ধরতে না পারলেও অভিযান করতে করতে পুলিশের মাথার ঘাম পায়ে পড়ে—এমন হতাশার কথা সাধারণ মানুষের মুখে শোনা যায়।

এখানে পুলিশের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ তোলা নয়, বরং বাস্তবতার মূল্যায়ন জরুরি।

একটি অভিযানের সফলতা শুধু কতজনকে ধরা হলো, তার সংখ্যায় নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। দেখতে হবে—

মূল অপরাধী ধরা পড়েছে কি না।

মাদক সরবরাহের চক্র ভাঙা গেছে কি না।

পলাতক আসামিদের আইনের আওতায় আনা গেছে কি না।

বারবার অপরাধ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।

শুধু অভিযান চললে হবে না, অপরাধের শিকড়ে আঘাত করতে হবে।

মাদকবিরোধী র‍্যালিতে মাদকসেবীর ছবি!

মাদকবিরোধী র‍্যালি হয়।

সমাবেশ হয়।

মাইকে বক্তব্য হয়।

ব্যানার ও ফেস্টুন থাকে।

ছবি তোলা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হয়।

তারপর প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন কোনো মাদকবিরোধী কর্মসূচির ছবি ভাইরাল হয় এবং সেখানে মাদকসেবন বা মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়।

তখন প্রশ্ন ওঠে—

মাদকবিরোধী কর্মসূচি আসলে কার বিরুদ্ধে?

মাদকসেবীর বিরুদ্ধে?

নাকি মাদকসেবীকে নিয়ে ছবি তুলে নিজেদের প্রচারের জন্য?

একটি মাদকবিরোধী কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতা তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যখন সেখানে বিতর্কিত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়।

শুধু র‍্যালি করলেই মাদক বন্ধ হয় না।

শুধু স্লোগান দিলেই ইয়াবার বাজার বন্ধ হয় না।

শুধু ছবি পোস্ট করলেই সমাজ মাদকমুক্ত হয় না।

মাদক বন্ধ করতে হলে মাদকের উৎস বন্ধ করতে হবে।

কারবারিদের ধরতে হবে।

মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মাদকসেবীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবক আছে বলেই ‘সেলিব্রেট’!

আজকাল অনেক সামাজিক ও সরকারি কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীদের আনা হয়।

অভিভাবকদের ডাকা হয়।

মাঠ ভরে যায়।

তারপর ছবি তোলা হয়।

অনুষ্ঠান সফল ঘোষণা করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট হয়।

গণ্যমান্য ব্যক্তিরা নিজেদের উপস্থিতি ও ভূমিকা ‘সেলিব্রেট’ করেন।

কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে সেই শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে?

কাদের সঙ্গে মিশছে?

তাদের এলাকায় মাদক আছে কি না?

তারা নিরাপদ কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

এক দিনের মাদকবিরোধী র‍্যালি নয়, বছরের প্রতিটি দিন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে মাদকের উপস্থিতি রোধ করতে হবে।

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

শুধু অনুষ্ঠানের ছবি দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা যাবে না।

প্রতিদিন অভিযোগ আসে, কিন্তু সবাই থানায় যেতে পারে না

থানায় প্রতিদিন অসংখ্য অভিযোগ আসে।

জমি নিয়ে বিরোধ।

পারিবারিক কলহ।

মারামারি।

চুরি।

মাদক।

হয়রানি।

হুমকি।

প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য।

অসংখ্য অভিযোগের ভিড়ে অনেক মানুষের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়।

কিন্তু আরও ভয়ংকর বাস্তবতা হলো—অনেক মানুষ অভিযোগ করার সাহসই পায় না।

কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে?

অভিযোগ করার পর কী হবে?

অভিযোগকারী নিরাপদ থাকবে তো?

অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী হলে?

এই ভয়গুলো সাধারণ মানুষের মুখ বন্ধ করে দেয়।

কেউ জানে, কেউ দেখে, কেউ বোঝে—কিন্তু মুখ খোলে না।

কারণ ভয়।

প্রতিশোধের ভয়।

হয়রানির ভয়।

সামাজিক চাপের ভয়।

ক্ষমতাবানদের ভয়।

এই নীরবতা অপরাধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

সাধারণ মানুষ যদি নিরাপদে অভিযোগ করতে না পারে, তাহলে অপরাধের প্রকৃত চিত্র কখনোই সামনে আসবে না।

কথিত বিচারকরা যখন ‘বিচারবাণিজ্যের মেলা’ বসান

সমাজে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়োজন আছে। ছোটখাটো সামাজিক বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়াও স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোনো কোনো এলাকায় কি সেই সামাজিক বিচারব্যবস্থাকে ব্যবসায় পরিণত করা হচ্ছে?

সাধারণ মানুষের অভিযোগ, কোথাও কোথাও কথিত বিচারকরা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে এক ধরনের বিচারবাণিজ্যের পরিবেশ তৈরি করেছেন।

যেখানে ন্যায়বিচারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—

কার পরিচয় কী?

কার সঙ্গে কার সম্পর্ক?

কে কতটা প্রভাবশালী?

কার পেছনে কত ক্ষমতা আছে?

আর অভিযোগকারীর অভিযোগ সত্য হলেও, তিনি যদি দুর্বল হন—তাহলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

কারণ অপরাধের বিচার আইন করবে।

আইনের বিষয় আইন অনুযায়ী চলবে।

চুরি, মাদক, সহিংসতা কিংবা গুরুতর অপরাধকে স্থানীয়ভাবে ‘মীমাংসা’ করে চাপা দেওয়া কোনো সমাধান নয়।

আজ যে অপরাধীকে মীমাংসা করে ছেড়ে দেওয়া হলো, কাল সে আরও বড় অপরাধ করতে পারে।

দুর্গম এলাকা কি দায়িত্ব অবহেলার অজুহাত?

মেঘনার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকা যোগাযোগের দিক থেকে এখনো চ্যালেঞ্জিং।

নদীপথ।

দূরত্ব।

যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

জনবল সংকট।

এসব বাস্তব সমস্যা রয়েছে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—

দুর্গম এলাকা বলে কি দায়িত্ব অবহেলার কোনো হিসাব দিতে হবে না?

কোনো এলাকায় সেবা পৌঁছাবে না।

অভিযোগের প্রতিকার হবে না।

অপরাধী ধরতে দেরি হবে।

প্রশাসনের নজর থাকবে না।

তারপর বলা হবে—এটা দুর্গম এলাকা।

দুর্গমতা কোনো দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স হতে পারে না।

বরং দুর্গম এলাকাই বেশি নজরদারি, বেশি দায়িত্ব এবং বেশি জবাবদিহি দাবি করে।

যে মানুষ শহরের কাছাকাছি থাকে, সে হয়তো সহজে থানায় যেতে পারে। কিন্তু একটি দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষকে অভিযোগ জানাতে কত পথ পাড়ি দিতে হয়—সেই বাস্তবতা বুঝতে হবে।

সেবা যেখানে পৌঁছানো কঠিন, সেখানে দায়িত্ব আরও বেশি।

যারা নেয়, তারাই যদি ‘সোল এজেন্ট’ হয়!

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারাই যদি অভিযোগের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে?

যারা সুবিধা নেয়, তারাই যদি সুবিধা দেওয়ার ‘সোল এজেন্ট’ হয়?

যারা সমস্যার অংশ, তারাই যদি সমাধানের বড় বক্তা হয়?

তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

কার ওপর বিশ্বাস করবে?

একটি সমাজ তখনই বিপদে পড়ে, যখন অপরাধী, সুবিধাভোগী এবং ক্ষমতাবানদের মধ্যে অলিখিত সমঝোতা তৈরি হয়।

অভিযোগ থাকবে।

প্রতিবাদ থাকবে।

কিন্তু ফলাফল থাকবে না।

তখন মানুষের মুখে ব্যঙ্গ করে একটি কথাই ফিরে আসে—

‘মিয়া-বিবি রাজি, তো করবে কী কাজী?’

যদি সব পক্ষ নিজেদের সুবিধা নিয়ে রাজি থাকে, তাহলে ন্যায়বিচারের দায়িত্ব নেওয়ার মানুষটি কী করবে?

কিন্তু রাষ্ট্র ও আইনের জায়গায় এই প্রবাদ চলতে পারে না।

আইনের চোখে অপরাধী অপরাধীই।

তার পরিচয়, প্রভাব কিংবা সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে আইন প্রয়োগ করা হলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না।

নীরবতা ভাঙতে হবে

মেঘনার সাধারণ মানুষ অনেক কিছু জানে।

কোথায় মাদক বিক্রি হয়।

কারা মাদক সেবন করে।

কোন এলাকায় কার প্রভাব।

কোথায় অপরাধের ঘটনা ঘটে।

কিন্তু মানুষ কথা বলে না।

কারণ মানুষ জানে না—তথ্য দিলে সে নিরাপদ থাকবে কি না।

এই জায়গায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে।

তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখতে হবে।

অভিযোগকারীকে হয়রানি থেকে রক্ষা করতে হবে।

সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে—আইনের কাছে গেলে সে একা নয়।

একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করবে যে অভিযোগ করার পর তার নিরাপত্তা থাকবে, তখন সে কথা বলবে।

আর যখন সাধারণ মানুষ কথা বলবে, তখন অপরাধীদের লুকিয়ে থাকা কঠিন হবে।

মেঘনার প্রয়োজন লোক দেখানো নয়, ফলাফল

আজ মেঘনার মানুষ শুধু অভিযান দেখতে চায় না।

মানুষ ফলাফল দেখতে চায়।

শুধু র‍্যালি নয়—মাদকমুক্ত এলাকা দেখতে চায়।

শুধু সমাবেশ নয়—নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখতে চায়।

শুধু মামলা নয়—বিচার দেখতে চায়।

শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা নয়—মূল হোতাদের আইনের আওতায় আসতে দেখতে চায়।

শুধু বড় বড় বক্তব্য নয়—বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়।

গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষক, সাংবাদিক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিক—সবাইকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।

মেঘনার সমস্যা একা পুলিশ সমাধান করতে পারবে না।

আবার শুধু জনপ্রতিনিধিরাও পারবেন না।

সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

পরিবারকে দায়িত্ব নিতে হবে।

শিক্ষকদের সচেতন হতে হবে।

জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব হতে হবে।

সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হবে।

শেষ কথা

একটি জনপদ একদিনে ধ্বংস হয় না।

ধীরে ধীরে সমাজের ভেতরে অপরাধের প্রতি সহনশীলতা তৈরি হয়।

মাদকের সঙ্গে আপস হয়।

অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।

অভিযোগকারী ভয় পায়।

বিচার বিকৃত হয়।

দায়িত্বশীলরা জবাবদিহি এড়িয়ে যায়।

আর সাধারণ মানুষ নীরব হয়ে পড়ে।

সেখান থেকেই শুরু হয় একটি সমাজের পতন।

মেঘনাকে সেই পথে যেতে দেওয়া যাবে না।

আজ যদি ইয়াবার বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে দাঁড়ানো না যায়, আগামী প্রজন্মকে এর ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে।

আজ যদি অপরাধীর বিরুদ্ধে কথা বলা না যায়, আগামীকাল অপরাধীরাই সমাজ নিয়ন্ত্রণ করবে।

আজ যদি লাশের খবরকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে একদিন মানবিকতাও হারিয়ে যাবে।

মেঘনার মানুষ আর শুধু ছবি দেখতে চায় না।

আর শুধু র‍্যালির স্লোগান শুনতে চায় না।

আর শুধু অভিযানের খবর পড়তে চায় না।

মানুষ জানতে চায়—

কোথায় নিরাপত্তা?

কোথায় জবাবদিহি?

কোথায় ন্যায়বিচার?

কোথায় মাদকমুক্ত মেঘনা?

সময় এসেছে লোক দেখানো আয়োজনের হিসাব বন্ধ করে বাস্তব ফলাফলের হিসাব দেওয়ার।

সময় এসেছে দুর্গমতার অজুহাত নয়, দায়িত্ব পালনের প্রমাণ দেওয়ার।

সময় এসেছে কথিত বিচারকদের বিচারবাণিজ্যের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার।

সময় এসেছে মাদকবিরোধী র‍্যালির ছবির চেয়ে মাদকের মূল হোতাদের গ্রেপ্তারের খবর বেশি দেখার।

মেঘনা আমাদের সবার।

এই জনপদকে বাঁচানোর দায়িত্বও আমাদের সবার।

লাশের গন্ধ নয়, জীবনের সুবাস চাই।

ইয়াবার ধোঁয়া নয়, সুস্থ ভবিষ্যৎ চাই।

লোক দেখানো নয়, জবাবদিহি চাই।

মেঘনায় ভয় নয়—আইনের শাসন চাই।

কারণ আর কতদিন আমরা বলব—

“মিয়া-বিবি রাজি, তো করবে কী কাজী?”

এখন সময় এসেছে কাজীকে নয়, পুরো ব্যবস্থাকেই জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানোর।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন