• রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৪ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
জাতীয়তাবাদে শিশু-কিশোর গড়ার সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন হ্নীলায় অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে কোস্ট ফাউন্ডেশনের ত্রাণ বিতরণ বেনাপোল সীমান্তে বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার পারিবারিক বিরোধের জেরে ফুলছড়িতে কৃষককে গলাকেটে হত্যা গুমের নাটক সাজিয়ে ২ বছর আত্মগোপন: নির্দোষ ঠিকাদারকে ৪ মাস জেল খাটিয়ে অবশেষে জীবিত উদ্ধার সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন লোহাগাড়ার লোহার দিঘীর পূর্ব পাশে দফাদার পাড়া সমাজের সরদার নির্বাচন-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবির দুইটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ মেঘনায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সেলিম আহমেদ গ্রেপ্তার

জাতীয়তাবাদে শিশু-কিশোর গড়ার সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ১ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লব সিকদার:

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার নতুন প্রজন্মের চিন্তা, চরিত্র, জ্ঞান ও দেশপ্রেমের ওপর। আজকের শিশু-কিশোরই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও সমাজ গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাই তাদের এমনভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তারা দেশকে ভালোবাসে, আইনকে সম্মান করে, মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বিকশিত হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে। এই আদর্শের প্রবক্তারা জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী সমাজ এবং দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে রাজনৈতিক আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তা, জাতীয় স্বকীয়তা, আত্মনির্ভরশীলতা, উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণ ছিল রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাঁর বক্তব্য ও নীতিমালায় যুবসমাজ এবং নতুন প্রজন্মকে দেশ গঠনের শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন বক্তৃতায় শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, গণতান্ত্রিক চর্চা, সুশাসন এবং তরুণ প্রজন্মের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ভবিষ্যতে তিনি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনের আলোকে শিশু-কিশোরদের জন্য কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে—তা নিয়ে নীতিগতভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত, শিশু-কিশোরদের জন্য একটি আধুনিক জাতীয় চরিত্র গঠন কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। সেখানে দেশের ইতিহাস, সংবিধান, স্বাধীনতা, জাতীয় প্রতীক, নাগরিক দায়িত্ব, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম কেবল পরীক্ষামুখী শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; তারা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে উঠবে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি উপজেলায় শিশু-কিশোর নেতৃত্ব বিকাশ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এসব কেন্দ্রে বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, তথ্যপ্রযুক্তি, রোবটিক্স, ভাষাশিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস ও দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিশুদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রোগ্রামিং, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল নৈতিকতা বিষয়ে বয়সোপযোগী শিক্ষা চালু করা হলে তারা ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হতে পারবে। একই সঙ্গে অনলাইন আসক্তি, গুজব ও সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতাও বাড়বে।

চতুর্থত, পরিবারকে শিশু-কিশোর গঠনের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে হবে। অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা, দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। কারণ, পরিবারেই একজন শিশুর ব্যক্তিত্বের ভিত্তি নির্মিত হয়।

পঞ্চমত, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাহিত্যচর্চা, নাটক, সংগীত, আবৃত্তি ও লোকসংস্কৃতির আয়োজন শিশুদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করবে এবং দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের সংযুক্ত রাখবে।

ষষ্ঠত, মাদক, কিশোর গ্যাং, সহিংসতা ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠন সমন্বিতভাবে কাজ করলে শিশু-কিশোরদের বিপথগামিতা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।

সপ্তমত, গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের বৈষম্য কমানো জরুরি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্নত বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, খেলার মাঠ এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা গেলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পাবে।

অষ্টমত, শিশু-কিশোরদের স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, দুর্যোগে সহায়তা, রক্তদান সচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম তাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আলোচনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—জাতীয় ঐক্য। নতুন প্রজন্মকে এমন শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা মতের ভিন্নতাকে সম্মান করে, সহিংসতার পরিবর্তে সংলাপকে গুরুত্ব দেয় এবং দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে নাগরিকদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আইনের শাসনের প্রতি আস্থা এবং গণতান্ত্রিক আচরণ অপরিহার্য।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা প্রয়োজন, শিশু-কিশোরদের রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ও উন্নয়ন কর্মসূচি এমন হওয়া উচিত, যা সংবিধান, আইন, মানবাধিকার এবং বহুমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে শিশুরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, শিখতে এবং নিজেদের যোগ্যতা বিকাশ করতে পারে। জাতীয় পরিচয় ও দেশপ্রেমের শিক্ষা যেন কখনো সমালোচনামূলক চিন্তা, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান বা নাগরিক স্বাধীনতার পরিপন্থী না হয়।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের শিশু-কিশোরদের ওপর। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, সততা, জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে পারলে একটি উন্নত, আত্মমর্যাদাশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের পথ আরও সুদৃঢ় হবে। যে-ই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকুন না কেন, নতুন প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণই হবে দেশের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।

লেখক: সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন