আল মামুন :
মেঘনা উপজেলার নদীবেষ্টিত চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন। ভৌগোলিক বাস্তবতায় এখানকার মানুষের জীবনযাত্রায় রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। বিশেষ করে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা, গ্রামীণ অবকাঠামো ও পরিবেশ রক্ষার মতো বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। এসব সমস্যা সমাধানে পরিকল্পিত উদ্যোগের কথা জানিয়ে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে চান অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান।
দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে আইন পেশায় যুক্ত অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন সময়ে সরকারি আইনজীবী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১১ সালে দলীয় সমর্থনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন নিয়ে আবারও চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও সক্রিয় এই আইনজীবী।
চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো, পরিবেশ, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং দলীয় মনোনয়ন নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি দলীয় সমর্থন শতভাগ আশাবাদী বলে জানিয়েছেন।
প্রশ্ন: চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে চান। আপনার এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ কী?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: চালিভাঙ্গার মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রাজনীতি করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকেছি। মানুষের সমস্যা কাছ থেকে দেখেছি এবং সাধ্য অনুযায়ী সমাধানের চেষ্টা করেছি।
আমি মনে করি, একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন না; তাঁকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, মানুষের কথা শুনতে হবে এবং প্রয়োজনে নিজের সামর্থ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। এই চিন্তা থেকেই এবার চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে চাই।
প্রশ্ন: এর আগেও আপনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা এবার কতটা কাজে আসবে?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: ২০১১ সালে দলীয় সমর্থনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছি। ২০১৬ সালে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। ফলে নির্বাচনী মাঠের বাস্তবতা আমার অজানা নয়।
ওই সময় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে। ইউনিয়নের কোথায় কী সমস্যা, মানুষের প্রধান চাহিদা কী—এসব বিষয় সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়েছে। এবার সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতাকে সমন্বয় করে একটি বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চাই।
প্রশ্ন: আপনার রাজনৈতিক পরিচয় ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: আমি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে মেঘনা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এর আগে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলাম।
এ ছাড়া রমিজ-শাহিন কমিটিতে মেঘনা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং হক সাব-বায়েজিদ কমিটিতে দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। হাবিবউল্লাহ সরকার-কামরুজ্জামান কমিটিতে চন্দনপুর ইউনিয়ন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং শহিদুল্লা সরকার-কামরুজ্জামান কমিটিতে চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি।
দলের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে।
প্রশ্ন: চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে প্রথম কোন কাজটিকে অগ্রাধিকার দেবেন?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো স্বাস্থ্যসেবা। চালিভাঙ্গা নদীবেষ্টিত ইউনিয়ন হওয়ায় জরুরি মুহূর্তে রোগীকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই আমি একটি নির্দিষ্ট অঙ্গীকার করতে চাই—চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে নিজস্ব অর্থায়নে চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের মানুষের জন্য ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করব, ইনশাআল্লাহ।
আমি চাই, রাত হোক বা দিন—জরুরি প্রয়োজনে কোনো রোগী যেন শুধু যানবাহনের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন।
প্রশ্ন: শুধু অ্যাম্বুলেন্স সেবা নয়, স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আরও কোনো পরিকল্পনা আছে?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: ইউনিয়নের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে চাই। মানুষের স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানো, জরুরি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো এবং দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসহায়তার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আমার লক্ষ্য হবে—স্বাস্থ্যসেবা যেন শুধু কাগজে-কলমে না থাকে; মানুষের প্রয়োজনের সময় বাস্তবে কাজে আসে।
প্রশ্ন: চালিভাঙ্গার রাস্তাঘাট ও যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা একটি ইউনিয়নের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। রাস্তা ভালো না হলে কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পারেন না, শিক্ষার্থীদের চলাচলে সমস্যা হয়, রোগী হাসপাতালে যেতে সমস্যায় পড়েন।
আমি ইতিমধ্যে বিভিন্ন সময়ে নিজস্ব অর্থায়নে গ্রামীণ রাস্তা, কাঁচা রাস্তা, ড্রেনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজে সহযোগিতা করেছি। নির্বাচিত হলে সরকারি বরাদ্দের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিগত উদ্যোগেও সহযোগিতা করব।
প্রশ্ন: সামাজিক কর্মকাণ্ডে আপনার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। কী ধরনের কাজ করেছেন?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রামীণ বনায়ন, রাস্তাঘাট সংস্কারসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজে সহযোগিতা করেছি।
গরিব ও হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কাপড়, শাড়ি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে নিজস্ব অর্থায়নে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেছি।
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্বাচনের অপেক্ষা করতে হয় না।
প্রশ্ন: অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আপনার ভূমিকা নিয়ে কী বলবেন?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: অবৈধ বালু উত্তোলন একটি এলাকার পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য বড় হুমকি। নদীর তীর, কৃষিজমি ও বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে।
আমি বিভিন্ন সময়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি এবং তা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে আপসহীন থাকব। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনবিরোধী বালু উত্তোলন প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে চাই।
প্রশ্ন: আপনার ৩১ বছরের আইন পেশার অভিজ্ঞতা জনপ্রতিনিধি হিসেবে কীভাবে কাজে লাগবে?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: গত ৩১ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতে আইন পেশায় আছি। বিভিন্ন সময়ে সরকারি আইনজীবী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের নানা সমস্যা ও আইনি বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।
একজন জনপ্রতিনিধির জন্য আইন জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অধিকার, সরকারি সেবা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সহযোগিতা করা সম্ভব হবে। আমি চাই, ইউনিয়নের মানুষ যেন তাদের ন্যায্য অধিকার ও সরকারি সেবা পেতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন।
প্রশ্ন: তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: তরুণদের বাদ দিয়ে ইউনিয়নের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাদের মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তরুণদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি করতে হবে। সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে চাই। আমি মনে করি, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের চালিভাঙ্গার নেতৃত্ব দেবে।
প্রশ্ন: দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: আমি দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে ইনশাআল্লাহ শতভাগ আশাবাদী। দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে আছি এবং বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছি। দুইবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় সমর্থন ও প্রতীকে নির্বাচন করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
তবে বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে দল অনেক বিষয় বিবেচনা করবে। দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করাই আমাদের দায়িত্ব।
প্রশ্ন: ভোটারদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: আমি ভোটারদের কাছে শুধু ভোট চাই না; তাদের আস্থা ও ভালোবাসা চাই। আমি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও দল-মত নির্বিশেষে সবার পাশে থাকতে চাই।
চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে আমার কাছে কোনো মানুষ ছোট-বড় হবে না। দরিদ্র, অসহায়, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, তরুণ, নারী—সব শ্রেণির মানুষের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের দরজা খোলা থাকবে।
প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন—চালিভাঙ্গার মানুষের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান: আমি বিশ্বাস করি, জনপ্রতিনিধিত্ব কোনো ভোগের বিষয় নয়; এটি মানুষের দেওয়া একটি আমানত। জনগণ আমাকে সেই দায়িত্ব দিলে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালনের চেষ্টা করব।
আমি চাই চালিভাঙ্গা হবে একটি মানবিক, জনবান্ধব ও উন্নত ইউনিয়ন। মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেব।
আমার রাজনীতি মানুষের জন্য, আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা মানুষের জন্য এবং আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও মানুষের জন্য। চালিভাঙ্গার মানুষ যদি আমাকে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ দেন, তাহলে কথা নয়—কাজের মাধ্যমে তার প্রতিদান দিতে চাই। ইনশাআল্লাহ।