জাপানের নাগোয়ায় লায়ন সাত্তারের জয়, বাংলাদেশের কুস্তিতে নতুন দিগন্ত

বিপ্লব সিকদার :
মেঘনার মাটিতে যার পরিচয় ‘লায়ন সাত্তার’, সেই আব্দুল সাত্তার এবার জাপানের নাগোয়ায় বাংলাদেশের কুস্তির ইতিহাসে নিজের নামটি নতুন করে লিখলেন। স্থানীয় কুস্তির আসর থেকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চ—সাত্তারের এই পথচলা শুধু একজন ক্রীড়াবিদের ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের কুস্তিতে সম্ভাবনার নতুন জানালা খুলে দেওয়ার গল্প।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) ২০২৬ এশিয়ান গেমসে পুরুষ ফ্রিস্টাইলের ৬৫ কেজি ওজন শ্রেণির কোয়ালিফিকেশন ম্যাচে নেপালের রাম কিশোর যাদবকে ১০–০ পয়েন্টে হারান আব্দুল সাত্তার। আন্তর্জাতিক কুস্তির নিয়ন্ত্রক সংস্থা United World Wrestling-এর প্রকাশিত ফলাফলেও তাঁর এই জয় ১০–০ ব্যবধানেই নথিভুক্ত হয়েছে।
United World Wrestling +1
এরপর শেষ ষোলোতে সৌদি আরবের আবদুলতিফ আলবকরির কাছে ১০–০ ব্যবধানে হেরে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নেন সাত্তার। পদকের লড়াইয়ে টিকে থাকতে না পারলেও প্রথম ম্যাচের জয়টি তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকল।

মেঘনার ‘লায়ন’ থেকে জাতীয় পতাকার কুস্তিগীর
সাত্তারের গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাঁর শিকড়। কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার সন্তান এই কুস্তিগীর স্থানীয় পর্যায়ের ঐতিহ্যবাহী কুস্তির আসর থেকেই নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন।
২০২৫ সালে হোমনার কলাকান্দি গ্রামে অনুষ্ঠিত রাতভর ঐতিহ্যবাহী কুস্তি প্রতিযোগিতায় ‘মেঘনার লায়ন সাত্তার’ হিসেবে অংশ নেন তিনি। দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১৫০ কুস্তিগীরের অংশগ্রহণের ওই প্রতিযোগিতায় সাত্তার রানারআপ হন। পুরস্কার হিসেবে পান একটি খাসি।
এই তথ্যটির মধ্যেই সাত্তারের ক্রীড়াজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লুকিয়ে আছে। গ্রামীণ মাঠের কুস্তি তাঁর কাছে নিছক বিনোদন ছিল না; সেটিই হয়ে উঠেছিল নিজেকে তৈরি করার জায়গা।
চট্টগ্রামের বলীখেলা থেকে বৃহত্তর প্রতিযোগিতার মঞ্চ
সাত্তারের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিসরও ছিল বিস্তৃত। কলাকান্দির ওই আসরে অংশ নেওয়া কুস্তিগীরদের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রামের আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলায় দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়া হোমনার বাঘা শরীফসহ বিভিন্ন এলাকার পরিচিত কুস্তিগীর। ছিলেন দাউদকান্দির টারজান দিপু, সোনারগাঁয়ের সরকার শরীফ, বাঞ্ছারামপুরের ওমর বাহারসহ আরও অনেকে।
অর্থাৎ সাত্তারের পথচলা কোনো একক এলাকার গণ্ডিতে আটকে ছিল না। মেঘনা থেকে হোমনা, দাউদকান্দি থেকে বাঞ্ছারামপুর, সোনারগাঁ থেকে রাজশাহী—বিভিন্ন এলাকার কুস্তিগীরদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই তিনি নিজের দক্ষতা শানিত করেছেন।
আর এখানেই স্থানীয় কুস্তির গুরুত্ব। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাওয়ার আগে একজন ক্রীড়াবিদকে অসংখ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জয়-পরাজয় ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সাত্তারের ক্ষেত্রেও সেই ধারাটিই দৃশ্যমান।
৫০ বছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে সাত্তারের সম্পর্ক
কলাকান্দির ঐতিহ্যবাহী কুস্তি প্রতিযোগিতাটি টানা প্রায় ৫০ বছর ধরে হয়ে আসছে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা বাড়ানো এবং এলাকার ঐতিহ্য ধরে রাখাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। কুস্তিটি স্থানীয়ভাবে হাডুডু বা বলীখেলা নামেও পরিচিত। এই ঐতিহ্যবাহী ধারার সঙ্গে আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক কুস্তির পার্থক্য থাকলেও দুটির মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে—শরীর, কৌশল, ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা।
সাত্তার সেই ঐতিহ্যবাহী মাটির লড়াই থেকে উঠে এসে এবার আন্তর্জাতিক নিয়মের কুস্তিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এ কারণেই তাঁর নাগোয়ার জয়কে শুধু একটি ম্যাচের ফলাফল দিয়ে দেখলে পুরো গল্পটি ধরা পড়ে না।
নাগোয়ায় কঠিন পরীক্ষার সামনে
২০২৬ এশিয়ান গেমসে ৬৫ কেজি ফ্রিস্টাইল বিভাগে সাত্তারের সঙ্গে ছিলেন এশিয়ার বিভিন্ন শক্তিশালী কুস্তি-দেশের প্রতিযোগীরা। United World Wrestling-এর তালিকায় এই বিভাগে ভারত, ইরান, জাপান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের কুস্তিগীরের নাম রয়েছে। মোট ২১ জন প্রতিযোগীর তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন সাত্তার।
United World Wrestling
প্রথম ম্যাচেই নেপালের রাম কিশোর যাদবকে ১০–০ ব্যবধানে হারিয়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি। এরপর সৌদি আরবের আবদুলতিফ আলবকরির কাছে ১০–০ ব্যবধানে হারলেও এই দুই ম্যাচ তাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ঝুলিতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

বিশেষ করে প্রথম ম্যাচের ফলটি দেখিয়েছে, বড় মঞ্চে বাংলাদেশের কুস্তিগীরও প্রতিপক্ষকে চাপে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
পদক না এলেও প্রাপ্তি কম নয়
ক্রীড়াঙ্গনে শেষ পর্যন্ত পদকই সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য। কিন্তু একজন ক্রীড়াবিদের বিকাশের পথে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচও গুরুত্বপূর্ণ।
সাত্তার এবার পদক পাননি। কিন্তু তিনি এশিয়ান গেমসের মঞ্চে লড়েছেন, একটি ম্যাচ জিতেছেন এবং এশিয়ার শক্তিশালী কুস্তি-পরিবেশের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন। এই অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতের প্রস্তুতির বড় সম্পদ হতে পারে।
একজন স্থানীয় কুস্তিগীরের আন্তর্জাতিক মঞ্চে ওঠার পথ তৈরি হয় এমন অসংখ্য অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই।
বাংলাদেশের কুস্তিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ সাত্তার
বাংলাদেশে ক্রিকেট, ফুটবল বা অন্যান্য জনপ্রিয় খেলাধুলার তুলনায় কুস্তির আলোচনার পরিসর তুলনামূলক ছোট। অথচ দেশের গ্রামগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে কুস্তি ও বলীখেলার ঐতিহ্য রয়েছে।
সাত্তারের গল্প সেই দুই বাস্তবতাকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে—একদিকে গ্রামীণ ঐতিহ্য, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চ।
নাগোয়ায় তাঁর অংশগ্রহণ তাই বাংলাদেশের কুস্তির জন্য একটি দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করেছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, নতুন প্রজন্মের কাছে এটি একটি বার্তা দিতে পারে—স্থানীয় পর্যায়ের খেলাধুলা থেকেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার পথ তৈরি করা সম্ভব।
কোচ শিরিনের সামনে আরেক অধ্যায়
এবারের আসরে বাংলাদেশের কুস্তি দলের কোচের দায়িত্বে রয়েছেন শিরিন সুলতানা। ফলে সাত্তারের আন্তর্জাতিক যাত্রার সঙ্গে কোচিং ও প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক কুস্তিতে প্রতিযোগিতার মান দ্রুত বদলাচ্ছে। শক্তি ও কৌশলের পাশাপাশি প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, উন্নত পুনর্বাসন ব্যবস্থা, পুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
সাত্তারের মতো কুস্তিগীরদের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরি করা গেলে স্থানীয় প্রতিভাকে আরও কার্যকরভাবে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একটি জয়, অনেক সম্ভাবনার গল্প
সাত্তারের নাগোয়া অভিযানকে তাই শুধু ১০–০ জয় এবং ১০–০ পরাজয়ের অঙ্কে আটকে রাখা যায় না।
এই গল্পে আছে মেঘনার মাটি, স্থানীয় কুস্তির ঐতিহ্য, বিভিন্ন জেলার প্রতিযোগিতা, চট্টগ্রামের বলীখেলার প্রভাব, জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে দাঁড়ানোর সাহস।
সাত্তারের সামনে এখন আরও বড় লক্ষ্য তৈরির সুযোগ রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কুস্তিগীর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই একটি জয় ভবিষ্যতের অনেক জয়ের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
মেঘনার ‘লায়ন সাত্তার’ নাগোয়ায় পদক জিততে পারেননি—কিন্তু তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের মাটিতেও আন্তর্জাতিক কুস্তির জন্য প্রতিভা তৈরি হয়।
সেই কারণেই সাত্তারের ১০–০ জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; এটি বাংলাদেশের কুস্তিতে নতুন দিগন্তের একটি দৃশ্যমান ইশারা।