প্রথম সংঘর্ষে মামলা না হওয়ায় দ্বিতীয়বার হামলার জেরেই কোহিনূর হত্যাকাণ্ড: কারাগারে ৩২

বিপ্লব সিকদার : অনুসন্ধানের প্রথম পর্ব:

মেঘনা-তিতাস সীমান্তের চর নিয়ে দীর্ঘ বিরোধ; আগেও সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক; দুই পক্ষের অভিযোগ নথিভুক্ত না হওয়ার অভিযোগ; পরের দফায় হামলায় কোহিনূর নিহত, ঘরবাড়ি ভাঙচুর-লুটপাট; ৬১ জনের নামে হত্যা মামলা হয়। পত্রিকা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে এ অনুসন্ধানের প্রথম পর্ব লেখা হয়েছে।
কুমিল্লার মেঘনা ও তিতাস উপজেলার সীমান্তবর্তী চর নিয়ে বিরোধ যেন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের স্থায়ী কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে একই বিরোধে একাধিকবার সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২৬ জুলাইয়ের হামলায় টেঁটাবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মেঘনার চরবিনোদপুর গ্রামের গৃহবধূ কোহিনূর আক্তার। আর সেই হত্যা মামলায় হাইকোর্টের আগাম জামিন শেষে নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে ৩২ আসামিকে কারাগারে যেতে হয়েছে। অপরদিকে চর বাটেরার বাসিন্দারা একই ঘটনায় কুমিল্লার আদালতে চর বিনোদ পুর বাসিন্দাদের আসামি করে কাউন্টার মামলা করেছেন এবং পুলিশ সেই মামলার আসামি গ্রেপ্তার করে কোর্টে প্রেরণ করেছে।
সোমবার কুমিল্লার আদালতে কোহিনূর আক্তার হত্যা মামলার ৩৮ আসামি হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত ছয়জনের জামিন মঞ্জুর করেন। বাকি ৩২ জনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। মামলার আরও তিন আসামি এদিন আদালতে হাজির হননি। এর আগে ২৫ আগস্ট মামলার ৪১ আসামি হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন নিয়েছিলেন।
কিন্তু কোহিনূর হত্যার ঘটনা যে হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, অনুসন্ধানে তার আলামত মিলছে আগের সংঘর্ষগুলোর ঘটনাপ্রবাহে। জুন মাসেও একই চর দখলকে কেন্দ্র করে মেঘনার আলীপুর ও তিতাসের চরবাটেরা গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। ওই ঘটনায় উভয় পক্ষের ৩০ থেকে ৪০ জন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও উঠেছিল।
ওই বিরোধের মূলে রয়েছে চরটির মালিকানা ও দখল। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বিরোধপূর্ণ বাটেয়ারা মৌজার ১৪ দশমিক ৭৫ একর জমি নিয়ে মেঘনার আলীপুরের বাসিন্দাদের এক ধরনের বন্দোবস্তের দাবি রয়েছে। অন্যদিকে তিতাসের চরবাটেরা এলাকার বাসিন্দারাও একই এলাকার ১০ দশমিক ১৪ একর জমির ইজারা নেওয়ার দাবি করে আসছেন। ফলে কাগজপত্র, বন্দোবস্ত, দখল ও সীমানা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ দীর্ঘদিনের।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, আগের সংঘর্ষের পর দুই পক্ষই থানায় অভিযোগ নিয়ে যায়। কিন্তু সেসব অভিযোগের কোনোটি বা সবগুলো কেন নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি, সে বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অভিযোগ, অজ্ঞাত কারণে অভিযোগগুলো কার্যকরভাবে নথিভুক্ত ও তদন্ত না হওয়ায় বিরোধ মীমাংসার বদলে আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তবে পুলিশি নথিতে এ অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ কোনো অভিযোগ জিডি হিসেবে নেওয়া হয়েছিল কি না, লিখিত অভিযোগ গ্রহণের পর পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং কেন মামলা হয়নি—এসবের উত্তর পাওয়া যাবে থানার জিডি, অভিযোগ গ্রহণের রেজিস্টার ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে।
এরই মধ্যে ২৬ জুলাই বিরোধ নতুন মাত্রা পায়। প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, তিতাসের চরবাটেরা এলাকার দুই বাসিন্দা ব্যক্তিগত কাজে মেঘনা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গেলে তাদের মারধর ও আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। পরে তাদের উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিকেলে মেঘনার চরবিনোদপুর-আলীপুর এবং তিতাসের নতুন ভাটেরাচর এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে টেঁটাযুদ্ধ শুরু হয়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে বিভিন্ন প্রতিবেদনে অন্তত ২০ থেকে ৬০ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে চরবিনোদপুর গ্রামের কাবিল মিয়ার স্ত্রী কোহিনূর আক্তার গলায় টেঁটাবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তাঁর বয়স বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৩৫, ৩৮ ও ৪৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে; স্থানীয় সূত্রে ৩৮ বছর বয়সের তথ্যটি বেশি পাওয়া যায়। তিনি চার সন্তানের মা ছিলেন বলেও স্থানীয় প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।
কোহিনূরের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তিতাসের চরবাটেরা এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মেঘনার চরবিনোদপুর ও আলীপুরের লোকজন নদী পেরিয়ে তাদের এলাকায় গিয়ে ঘরবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। আমার দেশ-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় ৩০টি বসতঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের কথা এসেছে।
অন্যদিকে চরবিনোদপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংঘর্ষের আগে তাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সহিংসতায় তাদের গ্রামেও ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগের বিরোধ, থানায় অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া এবং চর দখল নিয়ে পাল্টাপাল্টি শক্তি প্রদর্শন পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই কোহিনূর হত্যা মামলাটি দায়ের হয়। নিহতের স্বামী মো. কাবিল মিয়া বাদী হয়ে তিতাসের চরবাটেরা এলাকার ৬১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন। মেঘনা থানার পুলিশ প্রথম পর্যায়ে এজাহারভুক্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়।
পরবর্তীতে মামলার তদন্তে গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২ অক্টোবর আরও একজন আসামিকে আটকের তথ্য তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে। সর্বশেষ আদালতে ৩৮ জনের হাজিরা এবং ৩২ জনের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা মামলাটিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
কিন্তু অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—কোহিনূর হত্যার আগের সংঘর্ষগুলোর অভিযোগ কেন কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি হলো না?
আরও বড় প্রশ্ন, একই চর নিয়ে জুনে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হওয়ার পরও বিরোধপূর্ণ জমির দখল, সীমানা ও মালিকানা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে স্থায়ী সমাধান কেন হয়নি?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে দুই পক্ষই পৃথক ইজারা ও আদালতের রায়ের দাবি করে আসছে। অর্থাৎ বিরোধটি শুধু গ্রামবাসীর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নয়; এর সঙ্গে ভূমির মালিকানা, সরকারি বন্দোবস্ত, দখল এবং সীমানা নির্ধারণের প্রশ্নও জড়িত।
এ অবস্থায় শুধু হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সংঘর্ষের সূত্রপাত, আগের হামলার ঘটনা, দুই পক্ষের থানায় দেওয়া অভিযোগ, অভিযোগগুলো মামলা হিসেবে নথিভুক্ত না হওয়ার কারণ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাগুলো এবং বিরোধপূর্ণ চরটির প্রকৃত মালিকানা—সবকিছুর পৃথক তদন্ত প্রয়োজন।
বিশেষ করে ২৬ জুলাইয়ের সংঘর্ষের আগে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দুই ব্যক্তিকে মারধর ও আটকে রাখার অভিযোগ সত্য কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল বলে মামলার এজাহার ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
একই সঙ্গে কোহিনূর হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, চিকিৎসা ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, সংঘর্ষের ভিডিও ফুটেজ এবং মোবাইল ফোনের অবস্থানগত তথ্য থাকলে সেগুলো যাচাই করা জরুরি।
কারণ ৬১ জনের নামের সঙ্গে আরও ১৫০ থেকে ২০০ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এত বড় আসামি তালিকায় প্রকৃত হত্যাকারীকে শনাক্ত করা যেমন জরুরি, তেমনি নিরপরাধ কাউকে হয়রানি থেকে রক্ষা করাও তদন্তের দায়িত্ব।
অন্যদিকে চরবাটেরা এলাকার বাসিন্দাদের করা পাল্টা মামলায় কারা আসামি, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং সেই মামলার তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে—এ তথ্যও প্রকাশ্যে আনা প্রয়োজন। কারণ এক পক্ষের হত্যা মামলায় ৩২ জনের কারাগারে যাওয়ার পাশাপাশি অন্য পক্ষের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আসা উচিত।
এখন কোহিনূর হত্যার বিচার যেমন জরুরি, তেমনি চর নিয়ে রক্তক্ষয়ী বিরোধের মূল কারণ চিহ্নিত করাও জরুরি। অন্যথায় আজ ৩২ জন কারাগারে গেলেও আগামীকাল একই চরে নতুন করে সংঘর্ষ বাধার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন তাই একটাই—একটি চর নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, একাধিক সংঘর্ষ, শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত একজন নারীর প্রাণহানির পরও কি এবার প্রশাসন জমির মালিকানা ও সীমানা বিরোধের স্থায়ী নিষ্পত্তি করবে?
মেঘনা থানার ওসি মো. শহীদুল ইসলাম বলেছেন, মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে এবং সব আসামিকে আইনের আওতায় আনা হবে।
কিন্তু কোহিনূরের মৃত্যুর প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে হলে শুধু আসামি গ্রেপ্তার নয়—সহিংসতার পুরো ধারাবাহিকতার তদন্ত করতে হবে। কারণ এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটি দিনের সংঘর্ষের চেয়ে বড় যে বিরোধ কাজ করছে, সেটি নিষ্পত্তি না হলে চরটি আবারও রক্তাক্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।