বিপ্লব সিকদার :
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত হয়ে ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোববার বড়কান্দা ইউনিয়নের আমিরাবাদ ও সোমবার মাধবপুর গ্রামে দুর্ঘটনা দুটি ঘটে। পরপর প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে শোকের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) উপজেলার মাধবপুর গ্রামে অটোরিকশা দুর্ঘটনায় মো. সাজ্জাদ নামে এক শিশু নিহত হয়েছে। সে ওই গ্রামের শরীফ মিয়ার ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় জড়িত অটোরিকশাচালকের বাড়িও একই মাধবপুর গ্রামে। দুর্ঘটনার পর শিশুটির মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
এর মাত্র একদিন আগে রোববার (৪ অক্টোবর) বড়কান্দা ইউনিয়নের আমিরাবাদ গ্রামে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সজিব নামে এক যুবক নিহত হন। তিনি ওই গ্রামের জসিম মিয়ার ছেলে। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হন সামসুদ্দিন মিয়ার ছেলে সজিব। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেঘনার বিভিন্ন সড়কে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ চালকের হাতে অটোরিকশাসহ ছোট গণপরিবহন চলাচল করছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি, চালকদের ট্রাফিক আইন না মানা, সড়কের খানাখন্দ এবং পর্যাপ্ত নজরদারির ঘাটতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের মতে, গ্রামীণ সড়কে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের চলাচল বেড়েছে। কিন্তু যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস এবং নিয়মিত তদারকির বিষয়টি যথাযথভাবে নিশ্চিত হচ্ছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিতির ভিত্তিতে চালকরা যানবাহন চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অতিরিক্ত গতি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। অপেক্ষাকৃত সরু গ্রামীণ সড়কে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ভ্যান, পথচারী ও শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে চলাচল করে। সেখানে গতি নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সামান্য ভুলও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে মেঘনার বিভিন্ন সড়কে খানাখন্দ ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। সড়কের কোথাও গর্ত, কোথাও ভাঙা অংশ এবং কোথাও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানান। তবে এসব অভিযোগের কোনটি সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলোর সরাসরি কারণ ছিল, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
দুর্ঘটনার পর নয়, আগে দরকার নজরদারি
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু দুর্ঘটনার পর মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ, ইউনিয়ন পরিষদ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রথম ধাপে উপজেলার অটোরিকশা, টেম্পো ও অন্যান্য স্থানীয় গণপরিবহনের চালকদের একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। চালকের বৈধ লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও পরিচয় যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রতিটি যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অদক্ষ বা অনভিজ্ঞ চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা দরকার।
মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণ ও হেলমেট ব্যবহারে কঠোরতা প্রয়োজন। বিশেষ করে দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক ও বাজার এলাকায় নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি চালানো গেলে বেপরোয়া গতির প্রবণতা কমানো সম্ভব।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইউনিয়নভিত্তিক দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে সড়কের গর্ত সংস্কার, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, রাতে আলোর ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
একটি দুর্ঘটনা, একটি পরিবারের দীর্ঘশোক
সড়ক দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণের চলে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। মাধবপুরের শিশু সাজ্জাদের পরিবার যেমন সন্তান হারানোর শোক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে, তেমনি আমিরাবাদের সজিবের পরিবার হারিয়েছে তাদের স্বজনকে। আহত সজিবের পরিবার এখন চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।
শিশু সাজ্জাদের মৃত্যু বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে স্থানীয়দের। যে বয়সে একটি শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই সড়ক দুর্ঘটনায় তার জীবন থেমে যাওয়ার ঘটনা সড়ক ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মেঘনার জন্য এখনই সমন্বিত উদ্যোগ
২৪ ঘণ্টায় পৃথক দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু এবং একজনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি মেঘনার সড়কগুলোর সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করাও জরুরি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়কগুলো চিহ্নিত করবে, চালক ও যানবাহনের বৈধতা যাচাই করবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ও বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে সড়ক সংস্কার ও নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা হবে।
কারণ দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশের চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই একটি জীবন রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মেঘনার সাম্প্রতিক দুই দিনের ঘটনা সেই পুরোনো সত্যটিই আবার সামনে আনল—নিরাপদ সড়ক শুধু আইন প্রয়োগে নয়, চালকের দায়িত্ববোধ, সড়কের মান, প্রশাসনিক নজরদারি এবং সমাজের সম্মিলিত সচেতনতার ওপরও নির্ভরশীল।
মেঘনায় ২৪ ঘণ্টায় সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ দুইজনের মৃত্যু