https://bindubanglatv.com/
বিপ্লব সিকদার :
ইতিহাসের গৌরবকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার দায়িত্ব এখন মেঘনাবাসীর একটি জনপদের পরিচয় শুধু তার ভৌগোলিক সীমানা, নদী, খাল কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি জনপদ সমৃদ্ধ হয় তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম এবং গৌরবোজ্জ্বল মানুষের অবদানে। কুমিল্লার মেঘনা তেমনই একটি জনপদ, যার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা এবং শহীদ শামসুজ্জামান বীর উত্তমের নাম।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ কেবল একটি পরিবারের কিংবা একটি এলাকার গৌরব নয়; তা গোটা জাতির সম্পদ। শহীদ শামসুজ্জামানের নাম তাই মেঘনার ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচর্চায় বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার।
সোনারচরের সন্তান, দেশের বীর
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার সোনারচর গ্রামের সন্তান শহীদ মো. শামসুজ্জামান। তাঁর পিতা মো. দৌলত হোসেন, মাতা আয়েতুন নেছা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। একাত্তরে স্বাধীনতার ডাক তাঁকে শ্রেণিকক্ষ থেকে নিয়ে যায় রণাঙ্গনে।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরে জেড ফোর্সের অধীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত হন।
১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার নকশী বিওপিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যেও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সামনে এগিয়ে যান। শত্রুপক্ষের অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছে ভূমিমাইনের আঘাতে শহীদ হন এই সাহসী যোদ্ধা।
স্বাধীনতাযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে। তাঁর খেতাবের সনদ নম্বর ৪১।
একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও ব্যক্তিগত জীবনের সম্ভাবনাকে পেছনে ফেলে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগের ইতিহাস মেঘনার মানুষের জন্য চিরকালীন গর্বের।
গৌরবের ইতিহাস কি যথাযথভাবে সংরক্ষিত?
এখানেই মেঘনাবাসীর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। যে জনপদ একজন বীর উত্তমের জন্ম দিয়েছে, সেই জনপদে তাঁর স্মৃতি, জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে
সংরক্ষিত?
শুধু জাতীয় দিবসে ফুল দেওয়া কিংবা আনুষ্ঠানিক আলোচনায় নাম উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন তাঁর জীবন ও যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, তথ্যচিত্র নির্মাণ, স্মারক প্রকাশনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আলোচনা।
মেঘনার সোনারচরে তাঁর নামে একটি স্মৃতিসৌধ বা স্মৃতি কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সেখানে সংরক্ষিত হতে পারে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত, মুক্তিযুদ্ধের দলিল, ছবি, যুদ্ধের বিবরণ এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ।
পাশাপাশি তাঁর নামে শিক্ষাবৃত্তি চালু করা হলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। প্রতিবছর ৪ আগস্ট তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে।
মেঘনার উন্নয়নে ইতিহাস হোক প্রেরণা
মেঘনার উন্নয়ন বলতে শুধু রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অবকাঠামো নির্মাণকে বোঝায় না। একটি জনপদের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যও সমান গুরুত্ব পায়।
শহীদ শামসুজ্জামান বীর উত্তমের জন্মভূমি হিসেবে মেঘনার একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক পরিচিতি রয়েছে। এই পরিচিতিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে পারে পরিকল্পিত ঐতিহাসিক পর্যটন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণা এবং স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ কোনো দলীয় পরিচয়ের বিষয় হতে পারে না। এটি হওয়া উচিত সর্বজনীন জাতীয় দায়িত্ব।
নতুন প্রজন্ম জানুক শামসুজ্জামানের বীরত্বগাথা
আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানে না, তাদেরই মেঘনার সোনারচর গ্রামের এক তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য সম্মুখযুদ্ধে জীবন দিয়েছিলেন। অর্জন করেছিলেন রাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’।
এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। কারণ ইতিহাসবিমুখ জাতি তার শেকড়ের শক্তি হারায়। আর যে প্রজন্ম নিজের এলাকার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জানে, তারা নিজেদের পরিচয় ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ পায়।
মেঘনার সন্তান শামসুজ্জামান শুধু একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নন; তিনি একটি জনপদের আত্মপরিচয়ের অংশ, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের অংশ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের একজন বীর।
তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মেঘনার সোনারচর থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তাঁর বীরত্বগাথা ছড়িয়ে পড়ুক। প্রতিষ্ঠিত হোক তাঁর নামে স্মারক, সংরক্ষিত হোক তাঁর জীবন ও যুদ্ধের ইতিহাস।
যে মাটিতে একজন বীর উত্তম জন্ম নিয়েছেন, সেই মাটির মানুষের কাছে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের দায় কখনো শেষ হওয়ার নয়। শহীদ শামসুজ্জামান বীর উত্তমের আত্মত্যাগের ইতিহাস মেঘনার গর্ব হয়ে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
ইতিহাসের এই গৌরবই হোক মেঘনার সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।