ঢাকা   ০৬:০২:০৫ পিএম, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংবেদনশীল তথ্য বিক্রির অভিযোগে সিআইডির জালে অ্যাপ ডেভেলপার

বিপ্লব সিকদার
  • Update Time : Thursday, May 7, 2026,
  • 541 Time View
  • ৭ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

দেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), কল ডিটেইলস, মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ ও অর্থের বিনিময়ে বিক্রির অভিযোগে এক অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ডেভেলপারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতারকৃত মো. আরমান হোসেন (২২) একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ছাত্র বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সিআইডি জানিয়েছে, গত বছরের ৯ অক্টোবর সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) সাইবার মনিটরিং সেলের নিয়মিত নজরদারির সময় ‘Siam Howlader’ নামের একটি ফেসবুক আইডির মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন নজরে আসে। সেখানে এনআইডির পূর্ণাঙ্গ তথ্য, এসএমএস তালিকা, বিকাশ, নগদ ও রকেট অ্যাকাউন্টের তথ্য, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী এবং মামলা সংক্রান্ত তথ্য বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল।
বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নামে সিআইডি। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত ১৩ অক্টোবর লক্ষ্মীপুরের কমলনগর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. সিয়াম হাওলাদার (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন, সিমকার্ড, হার্ডডিস্কসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়। তার ব্যবহৃত স্মার্টফোনে ‘সব এখানে’ নামের একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সিয়াম স্বীকার করেন, ‘সব এখানে’ নামীয় অ্যাপ ও সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করা হতো। এ ঘটনায় সিআইডির এসআই মেহেদী হাসান বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করেন।
পরবর্তীতে তদন্তের সূত্র ধরে গত ২৮ অক্টোবর খুলনার কয়রা এলাকা থেকে চক্রটির অন্যতম অ্যাডমিন মো. আল আমিনকে (২৩) গ্রেফতার করা হয়। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি জানান, পুরো সিস্টেম ও অ্যাপটি তৈরি করেছে এক দক্ষ প্রোগ্রামার।
এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ৫ মে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার মানিকদি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ডেভেলপার মো. আরমান হোসেনকে গ্রেফতার করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। এ সময় তার কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন, ছয়টি সিমকার্ড—যার মধ্যে তিনটি বিকাশ মার্চেন্ট সিম—এবং একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়।
সিআইডি বলছে, আরমান প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে sobakhane.xyz, sobakhane.online ও sobakhane.info নামে একাধিক ওয়েবসাইট তৈরি করেন। পাশাপাশি ‘সব এখানে’ নামের অ্যাপ ডেভেলপ করে চক্রটির অন্য সদস্যদের সহায়তায় দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করতেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্রি হওয়া তথ্যের মধ্যে ছিল জাতীয় পরিচয়পত্রের পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ, এসএমএস তালিকা, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের তথ্য, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী এবং বিভিন্ন মামলা সংক্রান্ত তথ্য। এসব তথ্য রাষ্ট্রীয় গোপনীয় ডাটাবেজ থেকে অবৈধ উপায়ে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উৎস থেকে নাগরিকদের গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ করে আসছিল। চক্রটির সদস্যদের সঙ্গে আসামিদের হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগের তথ্যও পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।
গ্রেফতারকৃত আরমান হোসেনকে রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। সিআইডি জানিয়েছে, মামলার পূর্ণ রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের এমন ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তাই নয়, আর্থিক নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ চক্রগুলো এখন সাধারণ মানুষের তথ্যকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে রাষ্ট্রীয় ডাটাবেজ সুরক্ষা, তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সাইবার নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি উঠেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি