• বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ১২:৫১ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
মেঘনায় পৃথক অভিযানে গাঁজা-চোরাই মাল জব্দ চাঁদাবাজি,সন্ত্রাসী ও মাদককারবারি প্রতিহত করা হবে : ড.খন্দকার মারুফ প্রাইভেটকারে ৬০ কেজি গাঁজা, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চালক উধাও মেঘনায় ইয়াবাসহ আটক যুবক কারাগারে ডিইউজের আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে সভা, সমবায় পুনর্গঠনের দাবি মেঘনায় অটোরিকশার ব্যাটারি চুরির অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার, কিশোর আলাদা প্রক্রিয়ায় আদালতে প্রেরণ নদী খননে স্বচ্ছতা জরুরি এখন টিভিতে চার সাংবাদিকের ছুটি নিয়ে প্রতিবাদ সোমবার মেঘনায় জামায়াত ও যুবলীগ নেতার আধিপত্য ও পূর্ব শত্রুতা :সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত ১আহত ৪ মেঘনার মাধবপুরে ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেফতার

নদী খননে স্বচ্ছতা জরুরি

বিপ্লব সিকদার / ৫৩ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জনপদের বিকাশের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় দেশের বহু নদী আজ মৃতপ্রায়। কোথাও নাব্যতা হারিয়ে নদী পরিণত হয়েছে সরু খালে, কোথাও আবার বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সরকার দেশের বড় ও শাখা নদীগুলো পুনরুদ্ধারে খনন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।নদী খননের মূল উদ্দেশ্য হলো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নাব্যতা বৃদ্ধি, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ে, নৌপথ সচল থাকে, মৎস্যসম্পদ রক্ষা পায় এবং নদীভাঙন কমে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদী খননকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের নামে বাস্তবে নদী খননের পরিবর্তে বাণিজ্যিকভাবে বালু উত্তোলন চলছে। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।
বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে, নদী খননের জন্য চুক্তি অনুযায়ী কাটার ড্রেজার ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যবহার করা হচ্ছে লোড ড্রেজার। কাটার ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ পরিকল্পিতভাবে কেটে গভীরতা বাড়ানো সম্ভব হয়। কিন্তু লোড ড্রেজার দিয়ে শুধু সহজে বালু তোলা যায়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিক্রি করা হয়। এতে নদীর স্বাভাবিক গঠন বিনষ্ট হয়, সঠিক গভীরতা নিশ্চিত হয় না এবং খনন কার্যক্রম কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অর্থাৎ নদী খননের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের একটি সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
নদী খনন প্রকল্পে অনিয়মের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের ওপর। যেখানে পরিকল্পিত খননের প্রয়োজন, সেখানে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়, ভাঙন বৃদ্ধি পায় এবং আশপাশের বসতি ও ফসলি জমি ঝুঁকির মুখে পড়ে। অনেক এলাকায় নদীর একপাশ অতিরিক্ত গভীর হয়ে যাওয়ায় অপর পাশে চর জেগে ওঠে, ফলে নদীর ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক ভাঙন ও দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ে।এছাড়া নদী খননকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, অসাধু ঠিকাদার এবং কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ নতুন নয়। অনেক সময় প্রকল্পের কাজ বাস্তবে অর্ধেক হলেও কাগজে শতভাগ দেখানো হয়। কোথাও নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়, আবার কোথাও নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দায়সারা কাজ করা হয়। ফলে নদী খননের দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায় না। বরং কয়েক বছরের মধ্যেই নদী আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।সরকার নদী রক্ষায় যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তা জনগণের করের টাকা। তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শুধু প্রকল্প অনুমোদন দিলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং ও স্বাধীন তদারকি জোরদার করতে হবে। কোন এলাকায় কী পরিমাণ খনন হচ্ছে, কী ধরনের ড্রেজার ব্যবহার করা হচ্ছে, উত্তোলিত বালু কোথায় যাচ্ছে এসব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে যৌথ মনিটরিং কমিটি গঠন করা যেতে পারে।নদী খনন প্রকল্পে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো জরুরি। স্যাটেলাইট ম্যাপিং, ড্রোন পর্যবেক্ষণ এবং জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করলে প্রকল্পের অগ্রগতি সহজে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে অনিয়ম গোপন করার সুযোগ কমবে। একইসঙ্গে গণমাধ্যম ও স্থানীয় জনগণকে তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ দিলে তারা নজরদারির অংশীদার হতে পারবেন। কারণ বাস্তবতা হলো, অনেক অনিয়ম প্রথমে স্থানীয় মানুষ ও সাংবাদিকদের মাধ্যমেই সামনে আসে।
বাংলাদেশে নদী শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নৌপথ সচল থাকলে পরিবহন ব্যয় কমে, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছায় এবং শিল্পায়ন সহজ হয়। অন্যদিকে নদী হারিয়ে গেলে শুধু পরিবেশ নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নদী রক্ষাকে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।নদী খনন কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশগত ভারসাম্য। নদীর সঙ্গে মাছ, জলজ প্রাণী, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক গভীর। অপরিকল্পিত খনন ও অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে অনেক এলাকায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। ফলে নদী খননের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং খননের পর পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।

 

লেখক – সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন