• বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৩:২৫ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

বিদায়ের ফুলে লেখা চার দশকের গল্প

বিপ্লব সিকদার / ১৩১ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

রুহুল আমিনের অবসরে এক কর্মময় জীবনের প্রতিচ্ছবি

চাকরি জীবনের শেষ দিনটি কেমন হয়? চার দশকের বেশি সময় ধরে যে মানুষটি প্রতিদিন নির্দিষ্ট পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করেছেন, মানুষের নিরাপত্তার জন্য ছুটে বেড়িয়েছেন, অসংখ্য দিন-রাত থানার বারান্দা, ডিউটি রুম আর কর্মব্যস্ত পরিবেশে কাটিয়েছেন—তার জন্য শেষ কর্মদিবসটি নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি একটি যুগের সমাপ্তি, স্মৃতির অ্যালবামের শেষ পৃষ্ঠা এবং দায়িত্ব থেকে বিদায়ের এক আবেগঘন মুহূর্ত।মেঘনা থানার কনস্টেবল মো. রুহুল আমিনের অবসর গ্রহণের ঘটনাটি ছিল ঠিক এমনই এক মানবিক অধ্যায়। ৪০ বছর ৫ মাসের দীর্ঘ কর্মজীবনের পর যখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে গেলেন, তখন মেঘনা থানা প্রাঙ্গণ যেন শুধুই একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল না; সেটি পরিণত হয়েছিল স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক মিলনমেলায়।আমাদের সমাজে সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শক্ত ভিত গড়ে ওঠে সেইসব নীরব কর্মীদের ওপর, যারা বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। কনস্টেবল রুহুল আমিন ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। হয়তো তিনি কখনো বড় পদে আসীন হননি, সংবাদপত্রের শিরোনামও হননি। কিন্তু দায়িত্ববোধ, সততা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি সহকর্মীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।বিকেলে মেঘনা থানা প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনায় সেই ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কর্মকর্তা ও সদস্যরা যখন তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করছিলেন, তখন তাঁদের কণ্ঠে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রশংসা ছিল না; ছিল একজন সহযোদ্ধাকে হারানোর বেদনা।পুলিশের চাকরি নিছক একটি পেশা নয়। এটি এমন একটি দায়িত্ব, যেখানে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা। ঈদ, পূজা, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত আনন্দ সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তখন একজন পুলিশ সদস্যকে জেগে থাকতে হয়। যখন সমাজে সংকট দেখা দেয়, তখন তাঁকেই সবার আগে ছুটে যেতে হয়।রুহুল আমিনের ৪০ বছর ৫ মাসের কর্মজীবনও ছিল এমন অসংখ্য ত্যাগের গল্পে ভরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে সরকার, বদলেছে প্রযুক্তি, বদলেছে সমাজের চেহারা। কিন্তু বদলায়নি তাঁর দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার।একজন পুলিশ সদস্যের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো পদক নয়, বরং সহকর্মীদের সম্মান। বিদায় অনুষ্ঠানে সহকর্মীরা তাঁর সততা, শৃঙ্খলা, কর্মদক্ষতা ও আন্তরিকতার কথা যেভাবে স্মরণ করেছেন, সেটিই তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রকৃত স্বীকৃতি।আজকের সমাজে যখন নানা কারণে মূল্যবোধের সংকট নিয়ে আলোচনা হয়, তখন রুহুল আমিনের মতো মানুষের জীবন আমাদের নতুন করে আশাবাদী করে। কারণ সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ এখনো হারিয়ে যায়নি। এখনো এমন মানুষ আছেন, যারা নিঃশব্দে নিজের দায়িত্ব পালন করে যান, প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও কর্মের মাধ্যমে রেখে যান উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।বিদায় সংবর্ধনায় যখন তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন সেটি কেবল একজন ব্যক্তিকে সম্মান জানানো ছিল না। সেটি ছিল চার দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর অবদানের স্বীকৃতি।সহকর্মীদের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি যখন কর্মজীবনের নানা স্মৃতির কথা বলছিলেন, তখন হয়তো তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বহু বছরের পথচলা। প্রথম যোগদানের দিন, বিভিন্ন কর্মস্থলের স্মৃতি, অসংখ্য সহকর্মী, সফলতা ও চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ জীবনযুদ্ধের গল্প।মানুষের জীবনে অবসর একটি অনিবার্য অধ্যায়। কিন্তু সবাই অবসরে যান না একই সম্মান নিয়ে। কেউ কেউ বিদায় নেন নীরবে, আবার কেউ রেখে যান এমন এক উত্তরাধিকার, যা পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। রুহুল আমিনের বিদায় অনুষ্ঠান দেখে মনে হয়েছে, তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষদের একজন—যাঁদের কর্ম ও চরিত্র অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকে।
মেঘনা থানার নবীন সদস্যদের জন্যও এই বিদায় অনুষ্ঠান ছিল একটি শিক্ষা। তারা দেখেছে, দায়িত্বশীলতা ও সততার সঙ্গে কাজ করলে একদিন সহকর্মীদের শ্রদ্ধা অর্জন করা যায়। চাকরির শেষ দিনেও মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায়।বর্তমান সময়ে কর্মজীবনের সফলতা অনেক সময় অর্থ, পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতার মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। কিন্তু প্রকৃত সফলতা হলো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া। রুহুল আমিনের বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত সহকর্মীদের আবেগই প্রমাণ করে, তিনি সেই সফলতার উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছেন।একজন মানুষের কর্মজীবনের সমাপ্তি হয়তো ক্যালেন্ডারের একটি তারিখে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু তাঁর কর্ম, সততা ও আদর্শের কোনো অবসর নেই। সেগুলো বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণায়।মেঘনা থানার প্রাঙ্গণে  সেই বিকেল তাই কেবল একজন কনস্টেবলের বিদায় অনুষ্ঠান ছিল না। সেটি ছিল দায়িত্ব, সততা, ত্যাগ ও ভালোবাসার এক অনন্য স্বীকৃতি। ফুলের তোড়া, শুভেচ্ছা স্মারক আর সহকর্মীদের অশ্রুসজল চোখ যেন একটাই কথা বলছিল—চার দশক পাঁচ মাসের কর্মময় জীবনের সমাপ্তি ঘটলেও রুহুল আমিনের অবদান ও মানবিকতার গল্প মেঘনা থানার ইতিহাসে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
অবসর জীবনের নতুন অধ্যায়ে তিনি হয়তো আর পুলিশের পোশাক পরবেন না। কিন্তু তাঁর কর্মনিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্ববোধের যে উত্তরাধিকার তিনি রেখে গেলেন, সেটিই হবে তাঁর প্রকৃত পরিচয়। আর এ কারণেই বলা যায় এটি কোনো সাধারণ বিদায় নয়; এটি একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর গৌরবময় জীবনের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন