• শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০৪:২৬ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ

বেদখল হালট-খাল-খাস ও নদীর জমি উদ্ধার: মেঘনার অস্তিত্ব রক্ষায় এখনই কঠোর উদ্যোগ প্রয়োজন

বিপ্লব সিকদার / ৩৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতিতে নদী, খাল, বিল, হালট এবং খাসজমি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এগুলো একটি জনপদের পরিবেশ, অর্থনীতি, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং দুর্যোগ মোকাবিলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় বছরের পর বছর ধরে হালট, খাল, খাসজমি ও নদীর তীরবর্তী সরকারি জমি নানা উপায়ে বেদখলের শিকার হচ্ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তি, ভূমিদস্যু চক্র, রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে এসব জমি দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে সংকুচিত হচ্ছে জলপ্রবাহ, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য এবং ঝুঁকির মুখে পড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন ও জীবিকা।
মেঘনা উপজেলা নামের মধ্যেই রয়েছে একটি বৃহৎ নদীর পরিচয়। এই অঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা নদী ও জলাশয়কেন্দ্রিক। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীর, সরকারি খাসজমি, খাল এবং হালট ভরাট করে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনকি স্থায়ী স্থাপনাও নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি রেকর্ডে জলাশয় বা খাসজমি থাকলেও বাস্তবে সেগুলো ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও জলপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচ সংকট দেখা দিচ্ছে।
একটি উপজেলার পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই তার প্রাকৃতিক জলপথগুলোকে সচল রাখতে হয়। খাল ও হালট কেবল পানি চলাচলের মাধ্যম নয়, বরং এগুলো বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন কোনো খাল দখল বা ভরাট হয়ে যায়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আশপাশের জনপদে। জলাবদ্ধতা, ফসলহানি, মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত বিপর্যয় তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। মেঘনা উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে এমন বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
খাসজমি বেদখলের বিষয়টিও উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এসব জমি মূলত ভূমিহীন, অসহায় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যবহারের কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী মহল এসব জমি দখল করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছে। এতে একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছে। খাসজমি নিয়ে অনিয়ম ও দখলদারিত্ব একটি সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদীর জমি দখল আরও ভয়াবহ সমস্যা। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হলে নাব্যতা কমে যায়, ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ে এবং জলধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে নদী ও জলাশয় সংরক্ষণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান নয়।
মেঘনা উপজেলায় বেদখল জমি উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কিছু উদ্যোগ অতীতে দেখা গেলেও তা অনেক সময় ধারাবাহিক হয়নি। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরও পুনরায় দখলের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শুধু মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা।ভূমি প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। প্রথমেই উপজেলার সকল খাল, হালট, খাসজমি এবং নদীর সীমানা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে। ডিজিটাল ম্যাপিং, জিপিএস জরিপ এবং দৃশ্যমান সীমানা পিলার স্থাপনের মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তির সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই সীমানা অস্পষ্টতার সুযোগে দখলদাররা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।এছাড়া বেদখলকারীদের তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রে প্রশাসনের নিরপেক্ষ অবস্থানই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।জনসচেতনতাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় স্থানীয় জনগণ ভয় বা নিরুৎসাহিত হওয়ার কারণে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন না। অথচ একটি খাল বা নদী দখল হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জনপদ। তাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, পরিবেশবাদী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, উন্নয়নের নামে কোনোভাবেই জলাশয় ধ্বংসের সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাস্তা, বাজার বা অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন থাকলেও তা অবশ্যই পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে করতে হবে। পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত জনস্বার্থের পরিবর্তে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সরকার নদী রক্ষা, জলাশয় সংরক্ষণ এবং সরকারি জমি উদ্ধার কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযানও পরিচালিত হয়েছে। মেঘনা উপজেলাতেও একই ধরনের দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে। শুধু অভিযানের ছবি বা সংবাদ প্রকাশ নয়, বরং স্থায়ীভাবে সরকারি সম্পত্তি রক্ষা নিশ্চিত করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
মেঘনা উপজেলার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে বেদখল হালট, খাল, খাসজমি ও নদীর জমি উদ্ধারে এখনই কঠোর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। অন্যথায় দখলদারিত্বের এই প্রবণতা একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখানে পরিবেশগত ক্ষতি আর সহজে পূরণ করা যাবে না।মেঘনার নদী, খাল ও সরকারি জমি কেবল বর্তমান প্রজন্মের সম্পদ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও অধিকার। সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। তাই আর বিলম্ব নয়—মেঘনার অস্তিত্ব, পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় বেদখল হালট-খাল-খাস ও নদীর জমি উদ্ধারে এখনই সর্বাত্মক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। এটাই সময়ের দাবি, জনস্বার্থের দাবি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক – সাংবাদিক ।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন