• বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০২:০৫ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শৃঙ্খলাই এখন সবচেয়ে জরুরি অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স, মেঘনায় উন্নয়ন বঞ্চিত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে — ড. মোশাররফ কোরবানির পশুর হাট ইজারাদার: শুধু ব্যবসা না আধিপত্য মেঘনায় ইয়াবাসহ আটক মোসলেম মিয়াকে কারাগারে প্রেরণ “তিন মাসে চার খুন” বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন, একটি হত্যাকাণ্ডের তথ্য মিলছে না মেঘনায় জমি সংক্রান্ত জেরে ভাইয়ের বিরুদ্ধে খুন-জখমের আশঙ্কার অভিযোগ দেশে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলছে এনসিপি: হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি নির্বাচনী গণসংযোগে হামলার মামলায় আ’লীগের ৮৬ নেতাকর্মী আসামি মেঘনায় পৃথক অভিযানে গাঁজা-চোরাই মাল জব্দ চাঁদাবাজি,সন্ত্রাসী ও মাদককারবারি প্রতিহত করা হবে : ড.খন্দকার মারুফ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শৃঙ্খলাই এখন সবচেয়ে জরুরি

বিপ্লব সিকদার / ৪০ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণরেখা বলা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক-কে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম, শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও রাজধানী ঢাকাকে যুক্ত করা এই করিডর শুধু একটি সড়ক নয়; এটি দেশের বাণিজ্য, শিল্প, আমদানি-রপ্তানি ও জাতীয় অর্থনীতির স্পন্দন। অথচ বছরের পর বছর এই মহাসড়ক বারবার ভয়াবহ যানজট, অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা ও দখলদারিত্বের শিকার হচ্ছে। ঈদ এলেই কয়েকশ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—চার লেন করার পরও কেন এই মহাসড়ক স্বস্তি দিতে পারছে না?বাস্তবতা হচ্ছে, সমস্যা শুধু সড়কের প্রশস্ততায় নয়; সমস্যা ব্যবস্থাপনায়, সমন্বয়ে এবং শৃঙ্খলার অভাবে।সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অংশে দীর্ঘ যানজটের খবর আবারও সামনে এসেছে। কুমিল্লার চান্দিনা অংশে ১০ কিলোমিটার যানজট, নারায়ণগঞ্জের মদনপুর-কাচপুর এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবিরতা এবং সীতাকুণ্ড এলাকায় ঈদপূর্ব ১৫ কিলোমিটার যানজট দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের প্রধান কারণগুলোর একটি হলো অপরিকল্পিত প্রবেশ ও বহির্গমন পথ। মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা বাজার, কারখানা, বাসস্ট্যান্ড ও স্থানীয় সংযোগ সড়ক থেকে প্রতিনিয়ত ছোট যানবাহন মূল সড়কে উঠে আসছে। কোথাও কোথাও সড়কের ডিভাইডার কেটে অবৈধ ইউ-টার্ন তৈরি করা হয়েছে। এতে দ্রুতগতির যানবাহনের গতি কমে যায়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং সামান্য চাপেই সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কুমিল্লার নন্দনপুর থেকে সুয়াগাজী পর্যন্ত মাত্র ১৫ কিলোমিটারে অন্তত ১২টি অবৈধ ইউ-টার্ন তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মহাসড়ককে স্থানীয় সড়কের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে এক্সপ্রেসওয়ে ধরনের চলাচল থাকার কথা, সেখানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি, ভ্যান এমনকি ধীরগতির কৃষিযানও চলাচল করছে। অনেক এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব যান চলাচল অব্যাহত রয়েছে। ফলে চার লেন সড়কও কার্যত সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ পার্কিং। বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির বাস মহাসড়কের ওপর দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিশেষ করে কাচপুর, মদনপুর, মেঘনা-গোমতী সেতু এলাকা, দাউদকান্দি ও চট্টগ্রামমুখী শিল্পাঞ্চলে এ চিত্র নিয়মিত। অনেক সময় একটি বিকল ট্রাক পুরো করিডরকে অচল করে দেয়। অথচ জরুরি রেকার বা দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি এখনও প্রকট।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যানজটের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারদর ও শিল্প উৎপাদনে। অর্থাৎ এটি শুধু যাত্রী ভোগান্তির বিষয় নয়; এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির প্রশ্ন।
এখন প্রশ্ন হলো—সমাধান কী?
প্রথমত, মহাসড়ককে মহাসড়ক হিসেবেই পরিচালনা করতে হবে। স্থানীয় সড়ক ও জাতীয় করিডরের ব্যবহারের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন আনতে হবে। অবৈধ ইউ-টার্ন, ডিভাইডার কাটা ও অননুমোদিত প্রবেশপথ বন্ধে কঠোর অভিযান চালাতে হবে। রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের কাছে প্রশাসনের নতি স্বীকার করার সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিকল্প সার্ভিস লেন ছাড়া অটোরিকশা বা স্থানীয় যান চলতে দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। অনেক উন্নত দেশে এক্সপ্রেসওয়েতে নির্দিষ্ট গতির নিচে যান চলাচলই নিষিদ্ধ। বাংলাদেশেও অন্তত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডরে এ নীতি কার্যকর করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক মনিটরিং ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশের গবেষকরাও স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যালিং ও যানবাহন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যানবাহনের চাপ বিশ্লেষণ ও সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করলে অপেক্ষার সময় কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে আমাদের মহাসড়কে এখনও পর্যাপ্ত সিসিটিভি, সেন্সরভিত্তিক মনিটরিং বা রিয়েল-টাইম ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম গড়ে ওঠেনি।
চতুর্থত, শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক আলাদা ট্রাফিক পরিকল্পনা দরকার। নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামমুখী করিডরে হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক একই সময়ে সড়কে ওঠে। অফিস ছুটি ও পণ্য পরিবহনের সময়সূচির মধ্যে সমন্বয় না থাকায় যানজট আরও তীব্র হয়। ভারী যানবাহনের জন্য সময়ভিত্তিক চলাচল নীতি কার্যকর করা যেতে পারে।
পঞ্চমত, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ না করলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। মহাসড়কে নির্ধারিত স্টপেজ, ডিজিটাল মনিটরিং ও কঠোর জরিমানা কার্যকর করা জরুরি।
তবে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে এমন ভাবার সুযোগ নেই। সম্প্রতি সরকারিভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরকে ১০ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ধারণা সামনে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ঠিক না করে শুধু নতুন প্রকল্প নিলে কি যানজট কমবে? অতীতে দেখা গেছে, নতুন সড়ক তৈরি হলেও অল্প সময়ের মধ্যে তা আবার বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে গেছে।
বাংলাদেশে সড়ক খাতে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো সমন্বয়হীনতা। সড়ক বিভাগ, হাইওয়ে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবহন মালিক সমিতি ও রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ফলে আইন প্রয়োগ অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনআলোচনায়ও মানুষ বারবার একই অভিযোগ তুলছে নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন, অবৈধ পার্কিং ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ট্রাফিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক শুধু একটি সড়ক নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। এই করিডর অচল মানে বন্দর অচল, সরবরাহ ব্যবস্থা অচল, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া। তাই এখন সময় এসেছে খণ্ডিত নয়, সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার।কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বিকল্প সার্ভিস রোড নির্মাণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা এই পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অন্যথায় হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্পও শেষ পর্যন্ত যানজটের বৃত্তেই আটকে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন