• শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
সুফিবোধে ঋদ্ধ সাহসী ছাত্রনেতা দ্বীন মোহাম্মদ দিলু দেবিদ্বারে অবৈধ ড্রেজারবিরোধী অভিযান, তিন ড্রেজার ও ১৫ শত ফুট পাইপ ধ্বংস মেঘনায় শিক্ষিকার বাসায় ১৩ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার চুরি, যুবক কারাগারে মিমের মৃত্যুরহস্য: ডিজিটাল আলামতে মিলতে পারে সূত্র মেঘনায় এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে অনুপস্থিত ৪ পরীক্ষার্থী মেঘনায় ভোরে আঞ্চলিক সড়কে নারীর মরদেহ উদ্ধার বালতি দিয়ে মেপে জিআর চাল বিতরণে প্রশ্ন উঠেছে মেঘনায় চায়ের দোকানে গাঁজা বিক্রি করা সেই রিপন কারাগারে মাদকের আগ্রাসনে নীরবতা ভাঙার এখনই শেষ সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা :বাবুরহাট–মতলব বেড়ীবাঁধ–দাউদকান্দি সড়ক ১০.৩০ মিটার প্রশস্ত করার উদ্যোগ

সুফিবোধে ঋদ্ধ সাহসী ছাত্রনেতা দ্বীন মোহাম্মদ দিলু

বিপ্লব সিকদার / ২৮ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে কিছু মানুষ পদ-পদবির গণ্ডি ছাড়িয়ে স্মৃতির অংশ হয়ে থাকেন। তাঁদের অনুপস্থিতিও দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হয় সহযোদ্ধাদের হৃদয়ে। কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার ছাত্ররাজনীতিতে তেমনই একটি নাম দ্বীন মোহাম্মদ (দিলু)। মেঘনা উপজেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি শুধু একটি সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলেননি, বরং একটি প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। গতকাল ( ৩জুন) তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যায় একজন আদর্শবাদী, কর্মীবান্ধব ও দূরদর্শী ছাত্রনেতার জীবনসংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
দ্বীন মোহাম্মদ দিলুর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সুফিবাদী চিন্তাচেতনা। রাজনীতির উত্তপ্ত পরিবেশেও তিনি আত্মিক মূল্যবোধ, ধৈর্য, সংযম এবং মানবিকতাকে গুরুত্ব দিতেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন বিনয়ী, সত্যবাদী এবং আত্মমর্যাদাবোধে দৃঢ়। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করলেও বিরোধ মেটাতে তিনি বিশ্বাস করতেন আলোচনায়, সংঘাতে নয়। তাঁর এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে সহকর্মী ও কর্মীদের কাছে আলাদা মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল।
একসময় মেঘনা উপজেলার ছাত্ররাজনীতি ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল দুর্বল, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তীব্র। সেই সময় গ্রামে গ্রামে হেঁটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে, তরুণদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে ছাত্রদলের সংগঠন বিস্তারে কাজ করতে হয়েছিল। সেই কঠিন সময়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন দ্বীন মোহাম্মদ দিলু। তিনি বিশ্বাস করতেন, শক্তিশালী সংগঠন গড়ে ওঠে তৃণমূলের কর্মীদের ওপর ভর করেই। তাই পদ-পদবির চেয়ে কর্মী তৈরিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
এই প্রতিবেদক বিপ্লব সিকদার তখন একই কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। দীর্ঘ সময় একসঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কাছ থেকে দেখেছি, কঠিন সিদ্ধান্তের মুহূর্তেও দিলু কখনো উত্তেজিত হতেন না। শান্তভাবে সহযোদ্ধাদের মতামত শুনতেন, আলোচনা করতেন এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করতেন। তাঁর এই নেতৃত্বগুণ অনেক জটিল পরিস্থিতিকে সহজ করে তুলেছিল।
দিলুর কণ্ঠ ছিল দৃঢ়, বক্তব্য ছিল স্পষ্ট এবং অবস্থান ছিল সাহসী। তবে সেই দৃঢ়তার সঙ্গে ছিল শালীনতা ও দায়িত্ববোধের অনন্য সমন্বয়। তিনি জানতেন কখন প্রতিবাদ করতে হয়, আবার কখন ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। তাঁর কাছে নেতৃত্ব মানে ছিল দায়িত্ব পালন, কর্মীদের পাশে থাকা এবং সংগঠনের স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা।
সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ছিল নিঃস্বার্থ। সংগঠনের একজন সাধারণ কর্মীর সমস্যাকেও তিনি নিজের সমস্যা হিসেবে দেখতেন। কর্মীদের উৎসাহ দেওয়া, ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরি করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উদার। অনেক তরুণ ছাত্রনেতা তাঁর হাত ধরেই রাজনীতির প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছেন। তাঁদের অনেকেই আজ বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করছেন। সেই অর্থে দ্বীন মোহাম্মদ দিলুর অবদান শুধু তাঁর সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর গড়ে দেওয়া নেতৃত্ব এখনো সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করছে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররাজনীতির ধরনও বদলেছে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে এসেছে নতুন মাত্রা, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, রাজনৈতিক বাস্তবতাও পরিবর্তিত হয়েছে। আজকের ছাত্রনেতারা মাঠে সক্রিয়, বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এমন দৃশ্য দেখে হয়তো দ্বীন মোহাম্মদ দিলু আনন্দিত হতেন। কারণ তিনি সবসময় একটি শক্তিশালী, আদর্শভিত্তিক ও কর্মীবান্ধব ছাত্রসংগঠনের স্বপ্ন দেখতেন।
বর্তমানে দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এমন সময়ে বারবার অনুভূত হয়, দ্বীন মোহাম্মদ দিলুর মতো একজন পরিণত, বিচক্ষণ ও আদর্শবাদী সংগঠক পাশে থাকলে হয়তো অনেক সিদ্ধান্ত, অনেক কর্মসূচি এবং অনেক সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও সমৃদ্ধ হতো। তাঁর অনুপস্থিতি আজও সহযোদ্ধাদের মনে গভীর শূন্যতার জন্ম দেয়।
রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি মূল্যবোধ, ত্যাগ, আদর্শ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতারও নাম। দ্বীন মোহাম্মদ দিলুর জীবন সেই শিক্ষাই দেয়। তিনি দেখিয়ে গেছেন, একজন নেতা তাঁর পদবির কারণে নয়, বরং তাঁর চরিত্র, আচরণ, কর্মীদের প্রতি ভালোবাসা এবং আদর্শিক দৃঢ়তার কারণেই মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন।
মৃত্যু মানুষের জীবনের অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, আদর্শ ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে মৃত্যুকেও অতিক্রম করেন। দ্বীন মোহাম্মদ দিলু তেমনই একজন মানুষ, যাঁর স্মৃতি এখনো সহযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে, সংগঠনের পুরোনো দিনের সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের শিক্ষা দেয়।দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। একই সঙ্গে তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। একজন সহযোদ্ধা হিসেবে বিশ্বাস করি, মানুষ চলে যায়, কিন্তু আদর্শ, সততা, সাহস এবং কর্মের উত্তরাধিকার কখনো হারিয়ে যায় না। মেঘনার ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে দ্বীন মোহাম্মদ দিলুর নাম সেই উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে থাকবে বহুদিন।

 

লেখক, সাংবাদিক ও রাজনীতিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন