• বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আংশিক আহ্বায়ক কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-চীন সংসদীয় মৈত্রী গোষ্ঠীর চেয়ারপারসন ড. খন্দকার মোশাররফ মেঘনায় ঝুঁকিপূর্ণ দুই গাছে আতঙ্কে দুই পরিবারের বসবাস এইচএসসি পরীক্ষা ও উদ্ভূত পরিস্থিতি: সংকট উত্তরণে আবেগের চেয়ে বিবেক ও যৌথ দায়বদ্ধতা বেশি প্রয়োজন সাতক্ষীরায় ধর্ষিতা শিশুর পাশে বিএনপি নেতা আব্দুর রউফ চট্টগ্রামের বন্যার্ত মানুষের পাশে স্টুডেন্ট মানব কল্যাণ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ চসিককে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করা হবে: মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন উখিয়ায় যৌথ অভিযানে পাচারের উদ্দেশ্যে মজুদ ১৩০ বস্তা ইউরিয়া সার উদ্ধার ভাঙ্গুড়ায় ৭ শিক্ষকের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ গাইবান্ধায় ছাত্রদলের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ ও ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ

এইচএসসি পরীক্ষা ও উদ্ভূত পরিস্থিতি: সংকট উত্তরণে আবেগের চেয়ে বিবেক ও যৌথ দায়বদ্ধতা বেশি প্রয়োজন

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

এইচ এম হাকিম:

প্রকৃতির আকস্মিক রূপবদল আমাদের মাঝে মাঝেই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক ও লোকালয় হুট করেই প্লাবিত হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পানির তীব্রতা ও পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনার কারণে গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক ও বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন পানির নিচে। প্রকৃতির এই আকস্মিক আচরণে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত, তখন তার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসে লেগেছে আমাদের তরুণ এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ওপর। বন্যা ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা গ্রহণ ও স্থগিত করা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে চরম উত্তেজনা। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, কিছু শিক্ষার্থী বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবি তুলে রাজপথে নেমেছে। কিন্তু আবেগের বশে নেওয়া এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং আন্দোলন পরিস্থিতিকে কতটা জটিল করে তুলছে, তা আজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আন্দোলনের নামে রাজপথে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা

দাবি আদায়ের অধিকার গণতান্ত্রিক সমাজে সকলেরই রয়েছে। কিন্তু সেই দাবি আদায়ের পথ যদি সহিংসতা ও জনভোগান্তির জন্ম দেয়, তবে তা মূল লক্ষ্যকেই কলঙ্কিত করে। আজ ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে যে ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, তা কোনোভাবেই সচেতন সমাজ আশা করেনি।

সকাল থেকেই পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ শিক্ষা বোর্ডের সামনে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অবস্থান নেয়। প্রথমার্ধে আন্দোলন শান্ত ও নিয়মতান্ত্রিক থাকলেও, দুপুরের পর কিছু অতি-উৎসাহী এবং উস্কানিদাতার অনুপ্রবেশে পরিস্থিতি দ্রুত ঘোলাটে হয়ে ওঠে।

গণপরিবহন ভাঙচুর ও পথচারী ভোগান্তি: দুপুরের পর দেশের ব্যস্ততম সড়কগুলোতে চলাচলকারী বেশ কয়েকটি গণপরিবহন ও সাধারণ মানুষের প্রাইভেট কারে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালানো হয়। সড়ক পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রাখায় রাজপথে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অ্যাম্বুলেন্সে থাকা মুমূর্ষু রোগী থেকে শুরু করে সাধারণ অফিসগামী মানুষ ও বয়োবৃদ্ধদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

সরকারি স্থাপনায় হামলা ও সংঘর্ষ: একপর্যায়ে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মী ও পুলিশের সাথে তাদের দফায় দফায় ধস্তাধস্তি হয়। বোর্ডে থাকা সরকারি সম্পত্তি ও সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুরের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং সাধারণ পথচারী আহত হন।

শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে কখনো শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এই সহিংসতা সাধারণ মানুষের সহানুভূতি অর্জনের পরিবর্তে উল্টো ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।

অতীতে শিক্ষা খাতের সংস্কার ও এহসানুল হক মিলনের আপসহীন নেতৃত্ব

যারা আজ আন্দোলনের মাঠে দাঁড়িয়ে বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন, তাদের হয়তো বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের ইতিহাস এবং এহসানুল হক মিলনের পূর্বতন অবদান সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেই। অতীতেও তিনি অতি বিচক্ষণতার সহিত এই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অত্যন্ত সফলভাবে পালন করেছিলেন। সেই সময়কার শিক্ষা খাত আর আজকের শিক্ষা খাতের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তাঁর আমলের কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ আজও দেশের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে:

নকল মুক্ত পরীক্ষা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন: বিংশ শতাব্দীর শেষে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশের পরীক্ষা পদ্ধতিকে গ্রাস করেছিল ‘নকলের মড়ক’। সেই অন্ধকার যুগ থেকে দেশকে মুক্ত করতে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। কোনো প্রকার রাজনৈতিক চাপ বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার না করে, গভীর রাতে ও পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে নিজে সশরীরে কেন্দ্রে কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে নকল সরবরাহকারী ও অসদুপায় অবলম্বনকারীদের হাতেনাতে ধরেছেন। তাঁর এই আপসহীন অনমনীয় পদক্ষেপের ফলেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘নকল মুক্ত’ পরীক্ষা পদ্ধতির যুগে প্রবেশ করে।

প্রশ্নফাঁসের কঠোর প্রতিরোধ: বর্তমানের মতো উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি বা সিসিটিভি ক্যামেরা সে আমলে ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁর অসাধারণ গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক নজরদারির কারণে প্রশ্নফাঁসের সিন্ডিকেটগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। প্রশ্ন কেনাবেচার বাজার তিনি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সক্ষম হন।

সেশন জটের অভিশাপ থেকে মুক্তি: দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা সেশন জট নিরসনে তিনি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মতান্ত্রিক ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করে তিনি লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে গতি ফিরিয়ে এনেছিলেন।

যিনি শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কারিগর, তাঁকে আজ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো চরম অকৃতজ্ঞতা ও অবিবেচকতার শামিল।

পরীক্ষা আয়োজনের যৌথ দায়বদ্ধতা: মন্ত্রী একা দায়ী নন

একটি সাধারণ সত্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে—এইচএসসি বা সমমানের একটি বিশাল জাতীয় পাবলিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা কোনো একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। এটি একটি অত্যন্ত জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যেখানে বহু স্তরবিশিষ্ট চেইন কাজ করে।

 

নীতিনির্ধারণী পর্যায়: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা সচিব এবং দেশের সকল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সমন্বয়ে সামগ্রিক খসড়া তৈরি হয়।

field-level বা মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন: মাঠ পর্যায়ে সরাসরি দায়িত্বে থাকেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। প্রতিটি কেন্দ্র পরীক্ষা নেওয়ার উপযোগী কি না, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে কি না—তার চাক্ষুষ রিপোর্ট দেন তারা।

বাস্তবায়নকারী শক্তি: কেন্দ্র সচিব, শিক্ষক, ম্যাজিস্ট্রেট এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অংশগ্রহণে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

যখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, রাস্তাঘাটের বন্যা এবং মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের দেওয়া বাস্তব রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষা স্থগিত বা বিকল্প চিন্তা করা হয়, তখন তার পুরো দায় একা শিক্ষা মন্ত্রীর ওপর চাপানো কতটা যৌক্তিক? দেশের এই বিশাল দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রশাসন সম্মিলিতভাবে যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক মঙ্গলের জন্যই নেওয়া হয়। এখানে এককভাবে কাউকে বলির পাঁঠা বানানো মোটেও কাম্য নয়।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রীর বার্তা এবং আর একটি সুযোগের যৌক্তিকতা

আজকের উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে অত্যন্ত ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল বক্তব্য রেখেছেন শিক্ষা মন্ত্রী। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন:

“আমরা বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যালোচনা করছি। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকার। প্রয়োজনে তাদের পরীক্ষাটি পুনরায় গ্রহণের ব্যাপারেও আমরা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেব। আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। তারা আমার সন্তানের মতো; আমি অনুরোধ করব তোমরা বিশৃঙ্খলা পরিহার করে পড়ার টেবিলে ফিরে যাও।”

একই সাথে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প প্রশ্নপত্রের সেটে পরীক্ষা নেওয়ার বিশেষ টেকনিক্যাল প্রস্তুতিও শিক্ষা বোর্ড গ্রহণ করছে।

শিক্ষা মন্ত্রীর এই সহমর্মিতাপূর্ণ বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তিনি সমস্যার সমাধান করতে আন্তরিক। সংকটের এই ক্রান্তিলগ্নে তাকে টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে দেওয়ার জেদ না ধরে, তাকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত। অভিজ্ঞতা এবং কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যার রয়েছে, তিনিই পারেন এই অচলাবস্থা থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পথ বের করে দিতে।

বিকল্পের শূন্যতা: তিনি না থাকলে হাল ধরবে কে?

বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না—আজ যদি শিক্ষার্থীদের হঠকারী দাবির মুখে শিক্ষা মন্ত্রী পদত্যাগ করেন, তবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত কাকে করা হবে? এমন জাতীয় সংকটের মুহূর্তে নতুন কেউ এসে কি এহসানুল হক মিলনের মতো একজন প্রাজ্ঞ, দূরদর্শী এবং কঠোর প্রশাসক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন?

নতুন কোনো ব্যক্তির পক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো এই বিশাল ও জটিল প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞ বুঝে উঠতে উঠতেই দীর্ঘ সময় কেটে যাবে। এর ফলে পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য থমকে যাবে, যা প্রকারান্তরে শিক্ষার্থীদের সেশন জটের নতুন ও ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। আবেগ দিয়ে সাময়িক তৃপ্তি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তা ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কোনো কাজে আসে না।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন