• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২০ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মাকে হত্যা, তিন বছর পর রহস্য উন্মোচন

বিপ্লব সিকদার / ১৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

মাকে হত্যা করা হলো। মরদেহের মাথা পুঁতে রাখা হলো মাটিতে। গলায় পেঁচানো হলো সাদা রশি। মুখে রক্তাক্ত জখম। সবকিছুতেই যেন অন্য কারও হাতে হত্যার ছাপ।
পরদিন থানায় গেলেন নিহতের মেয়ে। বাদী হয়ে করলেন হত্যা মামলা। আসামি করলেন প্রতিবেশীসহ পাঁচজনকে। অভিযোগের তীর ছিল জমি নিয়ে বিরোধে থাকা প্রতিপক্ষের দিকে।
তিন বছর পর সেই মামলারই মোড় ঘুরে গেল।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই নিজের মাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন মামলার বাদী চাম্পা (৪৮)। পিবিআইয়ের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। পরে আদালতে দিয়েছেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি।
ঘটনাটি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সিন্ধ্রীগ্রামের। নিহত হালিমার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।
২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাত। সময় আনুমানিক ১১টা।
হাসপাতাল থেকে মাকে বাড়িতে আনা হয়েছিল। এরপর মীমাংসার কথা বলে তাঁকে বাড়ি থেকে বাইরে ডেকে নেওয়া হয়। পিবিআইয়ের তদন্ত বলছে, সেটিই ছিল হালিমার শেষ বের হওয়া।এরপর তাঁকে হত্যা করা হয়।
পরদিন বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ উত্তরের একটি পতিত জমি থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর মরদেহ। মাথার অংশ মাটিতে পোঁতা। গলায় সাদা রশি। মুখে রক্তাক্ত জখম।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই চাম্পা থানায় যান। নিজেই বাদী হয়ে মামলা করেন। প্রতিবেশী বিল্লালসহ পাঁচজনকে নামীয় আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকেও মামলায় আসামি করা হয়।
তদন্তের শুরুতে ঘটনাটি যেন জমি নিয়ে পুরোনো বিরোধেরই পরিণতি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে তদন্তের চিত্র।
৩০ বছরের জমির বিরোধ
পিবিআই বলছে, হালিমার সঙ্গে প্রতিবেশী বিল্লালের জমি নিয়ে বিরোধ ছিল প্রায় তিন দশকের।
প্রায় ৩০ বছর আগে বিল্লালের কাছ থেকে সাড়ে তিন শতাংশ জমি কিনেছিলেন হালিমা। কিন্তু ওই জমির কোনো দলিল ছিল না। পরে বিল্লাল সেই জমি দুলাল নামে আরেক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন।
এরপর জমির দখল ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ শুরু হয়।
বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। হালিমার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ মামলা করেন দুলাল। পাল্টা বিল্লাল ও দিলুর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন হালিমা।
মামলা-পাল্টা মামলায় দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে।
এর মধ্যেই ঘটে আরেক ঘটনা।
মারধরের ১৫ দিন পর হত্যা
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৫ দিন আগে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বিল্লাল হালিমাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
আহত হালিমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, হাসপাতালে থাকা অবস্থায় মাকে হত্যা এবং সেই দায় প্রতিপক্ষের ওপর চাপানোর পরিকল্পনা করেন চাম্পা ও তাঁর সহযোগীরা।
তদন্তকারীদের দাবি, তাঁদের ধারণা ছিল—হালিমাকে সরিয়ে দিতে পারলে বিরোধপূর্ণ জমি পাওয়ার পথ সহজ হবে। একই সঙ্গে পুরোনো বিরোধের কারণে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য করাও সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনা হয় হালিমাকে।
এরপর মীমাংসার কথা বলে তাঁকে বাড়ির বাইরে নেওয়া হয়।
সেখানেই ঘটে হত্যাকাণ্ড।
মরদেহ উদ্ধারে নতুন প্রশ্ন
হালিমার মরদেহ যেভাবে পাওয়া যায়, তাতেও ছিল রহস্য।
বাড়ি থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরে মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল। মাথার অংশ পুঁতে রাখা হয়েছিল মাটিতে। গলায় ছিল সাদা রশি। মুখে রক্তাক্ত জখম।
প্রশ্ন ওঠে—কারা হত্যা করল? কেনই বা মরদেহ এমনভাবে ফেলে রাখা হলো?
তৎকালীন মামলায় সন্দেহের তীর যায় জমি নিয়ে বিরোধে থাকা প্রতিবেশীদের দিকে।
কিন্তু তদন্তের দায়িত্ব পিবিআই নেওয়ার পর সেই গল্পে ফাটল দেখা দেয়।
বাদীর কথাতেই অসংগতি
মামলার তদন্তভার পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা নেওয়ার পর শুরু হয় নতুন করে তথ্য যাচাই।
ঘটনার সময়, স্থান, পারিপার্শ্বিকতা, বাদীর বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। ব্যবহার করা হয় তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য।
একপর্যায়ে তদন্তকারীদের নজরে আসে মামলার বাদী চাম্পার বক্তব্যের অসংগতি।
কথাবার্তায়ও মিলছিল না একাধিক তথ্য।
সেখান থেকেই সন্দেহ ঘনীভূত হয়।
তদন্তকারীরা চাম্পাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পিবিআইয়ের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে।
এরপর আর আগের মতো থাকেনি মামলার গতিপথ।
যাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে অন্যরা আসামি হয়েছিলেন, তদন্তের কেন্দ্রে চলে আসেন তিনিই।
আদালতে স্বীকারোক্তি
পিবিআইয়ের দাবি, চাম্পা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
১৮ আগস্ট তাঁকে কিশোরগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম বুলবুলের আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
এর আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।
বৃহস্পতিবার দুপুরে পিবিআই কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে তদন্তের এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে হালিমাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার দায় প্রতিপক্ষের ওপর চাপানো এবং বিরোধপূর্ণ জমি পাওয়ার পথ সহজ করাই ছিল পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিন বছর পর উল্টো স্রোত
একটি হত্যা মামলা কখনো কখনো শুধু খুনের রহস্য নয়, ঘটনার আড়ালে থাকা উদ্দেশ্যও সামনে আনে।
হালিমা হত্যার ঘটনাতেও তেমনটাই ঘটেছে।
প্রথমে প্রতিপক্ষ আসামি। বাদী ছিলেন নিহতের মেয়ে। তিন বছর ধরে তদন্ত এগিয়েছে সেই অভিযোগকে সামনে রেখেই।
কিন্তু তদন্তে যখন বাদীর বক্তব্যেই অসংগতি ধরা পড়ল, তখন প্রশ্ন উঠল—হত্যার অভিযোগ যাঁরা করেছিলেন, তাঁরাই কি ঘটনার প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন?
পিবিআইয়ের তদন্তে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, মাকে হত্যা করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পরিকল্পনাই ছিল পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু।
তবে তদন্তে উঠে আসা এসব তথ্যই শেষ কথা নয়। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য, আলামত ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে।
তিন বছর আগে যে মামলায় অন্যদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ করেছিলেন চাম্পা, এখন সেই মামলাতেই তিনি নিজে গ্রেপ্তার।
অর্থাৎ যে মামলার শুরু হয়েছিল একজন মায়ের হত্যার বিচার চেয়ে, তিন বছর পর সেই মামলাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাদীর বিরুদ্ধে।
আর তাতেই উন্মোচিত হয়েছে দীর্ঘদিনের জমি বিরোধের আড়ালে থাকা এক চাঞ্চল্যকর হত্যার অভিযোগ।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন