• বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

ম্যাজিক জালে বন্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের জলজ জীবনের দুয়ার

বিপ্লব সিকদার / ৫ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লব সিকদার :
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড় ও জলাশয়কে ঘিরেই এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় গ্রামবাংলার খাল-বিলের পানিতে দেশীয় মাছের বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বর্ষা এলেই পানির সঙ্গে আসত মাছ, আর মাছের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত মানুষের আনন্দ ও জীবিকার গল্প। কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নির্বিচারে মাছ ধরা, প্রজনন মৌসুমে পোনা নিধন, জলাশয় দখল-ভরাট, দূষণ, নদীর নাব্যতা সংকট এবং সর্বোপরি বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার দেশের জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যে ‘ম্যাজিক জাল’, ‘চায়না দুয়ারী’সহ অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের বিভিন্ন জাল নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। নাম যাই হোক, এসব জালের বৈশিষ্ট্য প্রায় একই—বাছবিচার ছাড়াই যা সামনে আসে, তা আটকে যায়। বড় মাছের সঙ্গে পোনা, ছোট মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুকসহ নানা জলজ প্রাণীও উঠে আসে। মাছ ধরার এই পদ্ধতিতে একজন হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কিছু লাভবান হন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিটা বহন করে পুরো সমাজ।
একটি পোনা আজ ধরা পড়লে সেটি শুধু একটি ছোট মাছ হারানো নয়। সেই পোনাটি বড় হয়ে প্রজনন করতে পারত। একটি মা মাছ হাজার হাজার ডিম দিতে পারত। সেই ডিম থেকে তৈরি হতে পারত নতুন প্রজন্মের মাছ। ফলে অতিসূক্ষ্ম জালে একটি মাছ ধরার অর্থ অনেক সময় ভবিষ্যতের বহু মাছের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করা। এই সহজ সত্যটি আমরা যত দ্রুত বুঝব, ততই দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষার সম্ভাবনা বাড়বে।
প্রশ্ন হচ্ছে, মাছ কমে যাচ্ছে কেন? শুধু জেলেদের দায়ী করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। নদী-খাল দখল ও ভরাট হচ্ছে, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, শিল্প ও গৃহস্থালির বর্জ্যে পানি দূষিত হচ্ছে, কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক পানিতে মিশছে। কোথাও নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে, কোথাও আবার খাল শুকিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত। পানির তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের ধরন, নদীর প্রবাহ ও জলজ পরিবেশে পরিবর্তন ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি আমরা একই সঙ্গে জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস করি, তাহলে সংকট আরও গভীর হওয়াই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় আইন আছে, প্রশাসন আছে, মৎস্য অধিদপ্তর আছে, অভিযান আছে, মোবাইল কোর্ট আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইন প্রয়োগ কতটা ধারাবাহিক? কোনো বিশেষ অভিযান শুরু হলে কয়েকদিন তৎপরতা দেখা যায়, এরপর আবার অনেক জায়গায় আগের চিত্র ফিরে আসে—এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। জাল জব্দ বা ধ্বংস করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জালের উৎপাদন, সরবরাহ, বিক্রি ও ব্যবহার—পুরো চক্রটিকে শনাক্ত করা।
একজন দরিদ্র জেলে যদি জীবিকার তাগিদে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেন, তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প জীবিকার কথাও ভাবতে হবে। কিন্তু যারা বাণিজ্যিকভাবে এসব ক্ষতিকর জাল উৎপাদন, সরবরাহ বা বাজারজাত করে জলজ সম্পদ ধ্বংসের ব্যবসা করছে, তাদের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু নদীর পানিতে জাল পাতা ব্যক্তিকে ধরে সমস্যার মূল উৎপাটন সম্ভব নয়।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে ভাবার সময় এসেছে। আমরা প্রায়ই মাছের বাজারদর নিয়ে উদ্বিগ্ন হই, কিন্তু মাছ কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে ততটা ভাবি না। বাজারে দেশীয় মাছের সরবরাহ কমলে দাম বাড়বে—এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেলে শুধু দাম বাড়বে না, ভবিষ্যতে কিছু দেশীয় প্রজাতি স্থানীয়ভাবে বিরলও হয়ে যেতে পারে। তখন টাকা থাকলেও সেই মাছ পাওয়া যাবে না।
দেশীয় ছোট মাছ আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৈ, শিং, মাগুর, টেংরা, পুঁটি, মলা, ঢেলা, চিংড়ি কিংবা বিভিন্ন স্থানীয় প্রজাতির মাছ শুধু খাবার নয়; এগুলো আমাদের জলজ প্রতিবেশের অংশ। একটি প্রজাতি কমে গেলে তার প্রভাব অন্য প্রজাতির ওপরও পড়তে পারে। কারণ প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীই একা বেঁচে থাকে না। প্রত্যেকটি প্রজাতি খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
এখানে গণসচেতনতারও বড় ভূমিকা রয়েছে। শুধু প্রশাসনের ওপর দায়িত্ব দিয়ে বসে থাকলে হবে না। জেলে, মাছ ব্যবসায়ী, জাল বিক্রেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী এবং সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ জাল কিনছেন, তিনিও সমস্যার অংশ। যে ব্যবসায়ী তা বিক্রি করছেন, তিনিও সমস্যার অংশ। আর যে মানুষ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন কিন্তু প্রতিবাদ করছেন না, তারও সামাজিক দায় রয়েছে।
মৎস্যসম্পদ রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে ‘অভয়াশ্রম’ বা প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণের উদ্যোগ আরও কার্যকর করা দরকার। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জলাশয়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই হবে না; তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবভিত্তিক হতে হবে।
নদী ও জলাশয়কে শুধু মাছ ধরার জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ। জলাভূমি বৃষ্টির পানি ধারণ করে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং বহু মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবে কাজ করে। জলাশয় ধ্বংস মানে শুধু একটি জলাশয় হারানো নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল এবং মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি ভিত্তি।সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—প্রকৃতির ক্ষতির অনেকটাই তাৎক্ষণিকভাবে চোখে দেখা যায় না। একটি নদীতে আজ কয়েক হাজার পোনা ধরা পড়ল, তার ক্ষতি হয়তো আজ বোঝা যাবে না। কিন্তু কয়েক বছর পর যখন ওই নদীতে মাছের প্রাচুর্য থাকবে না, তখন আমরা বুঝব আজকের সিদ্ধান্তের মূল্য কতটা বড় ছিল। তখন হয়তো অভিযান চালিয়েও আগের জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।তাই ‘ম্যাজিক জাল’ বন্ধের প্রশ্নটি কেবল একটি নিষিদ্ধ জাল বন্ধের প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের নদী, জলাশয়, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্ন। এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন। এটি লাখ লাখ জেলের ভবিষ্যৎ জীবিকার প্রশ্ন। সর্বোপরি এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই—সেই প্রশ্ন।
প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কোনো সমাজ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। নদী থেকে সব মাছ তুলে নিয়ে নদীকে শূন্য করে দিলে নদীও একসময় তার প্রতিশোধ নেয়—জীববৈচিত্র্য হারিয়ে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে, মানুষের জীবনে সংকট তৈরি করে।
এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। মাছ ধরতে হবে, কিন্তু মাছ শেষ করে নয়। নদী ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু নদী ধ্বংস করে নয়। জেলেদের জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু জলজ প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে নয়। উন্নয়ন করতে হবে, কিন্তু প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়।
বাংলাদেশের নদী-খাল-বিলের পানিতে আবার দেশীয় মাছের অবাধ বিচরণ দেখতে চাইলে এখনই কঠোর হতে হবে। ম্যাজিক জালের ফাঁস যত ছোটই হোক, তার ক্ষতি কিন্তু পুরো দেশের জন্য বিশাল। আজ যদি সেই ফাঁস ছিঁড়ে ফেলা না যায়, আগামী দিনে হয়তো আমাদের সন্তানদের বলতে হবে—একসময় এই নদীতে অনেক মাছ ছিল।সেই আফসোসের বাংলাদেশ আমরা চাই না। আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে নদী বাঁচবে, মাছ বাঁচবে, জলজ প্রাণী বাঁচবে এবং নদীর সঙ্গে বেঁচে থাকবে মানুষও।

 

 

লেখক – সাংবাদিক


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন