ঢাকা   ০২:১৯:১১ পিএম, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শরতের দূত হয়ে ফুটেছে ‘শিউলি’

Reporter Name
  • Update Time : Friday, October 2, 2026,
  • 10 Time View

৭ অক্টোবর ২০২৩, বিন্দুবাংলা টিভি. কম, ডেস্ক রিপোর্টঃ

অক্টোবরের প্রথম সকাল। রাতের আঁধার পেরিয়ে যখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে চারপাশ ছুঁয়ে যায়, তখন গাছতলায় সাদা-কমলা রঙের ছোট ছোট ফুলের মেলা। বাতাসে মিষ্টি সুবাস। বুঝতে বাকি থাকে না শিউলির সময় এসেছে।

শিউলি ফুটলেই যেন শরতের উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাতের নীরবতায় গাছে ফুটে থাকা ফুলগুলো ভোর হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। তাই সকালে বাইরে বের হলেই চোখে পড়ে অন্যরকম এক দৃশ্য। সবুজ ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে অসংখ্য সাদা পাপড়ি, মাঝখানে কমলা ডাঁটা। মনে হয়, কেউ যেন খুব যত্ন করে মাটির ওপর ফুলের আলপনা এঁকে রেখেছে।

শরতের অন্যতম চেনা ফুল শিউলি। সাদা পাপড়ি আর কমলা ডাঁটার এই ছোট্ট ফুলটির সৌন্দর্য খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না। রাতে ফুটে ভোরের আলোয় ঝরে পড়াই যেন তার স্বভাব। এই অল্প সময়ের সৌন্দর্যই শিউলিকে অন্য ফুলের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। ভোরের শিশিরে ভেজা শিউলির পাপড়িতে তাই চোখ আটকে যায় সহজেই।

শিউলির গন্ধও আলাদা। খুব তীব্র নয়, কিন্তু চারপাশে ছড়িয়ে পড়লে সহজেই বোঝা যায় কাছাকাছি কোথাও শিউলি ফুটেছে। ভোরের ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে মিশে সেই সুবাস তৈরি করে শরতের পরিচিত আবহ। শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাটেও কোনো বাড়ির আঙিনা বা পার্কের পাশে শিউলি ফুটলে কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও ব্যস্ততা থেকে মনটা যেন দূরে সরে যায়।

বাংলার মানুষের কাছে শিউলি শুধু একটি ফুল নয়; এটি শরৎ, শৈশব আর উৎসবের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগ। একসময় ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ছোট ঝুড়ি হাতে ফুল কুড়াতে বের হওয়ার স্মৃতি অনেকেরই আছে। গাছের নিচে পড়ে থাকা শিউলি কুড়িয়ে মালা গাঁথা, ঠাকুরের জন্য ফুল আলাদা করে রাখা কিংবা মায়ের হাতে তুলে দেওয়া; এসব ছোট ছোট মুহূর্ত আজও অনেকের মনে জায়গা করে আছে।

শিউলির সঙ্গে দুর্গাপূজারও রয়েছে গভীর সম্পর্ক। শরতের আকাশ, কাশফুল আর শিউলির সুবাস সব মিলিয়ে পূজার আগমনী অনুভূতি তৈরি হয়। তাই শিউলি ফুটতে শুরু করলেই অনেকের মনে উৎসবের অপেক্ষা শুরু হয়ে যায়। কোথাও ঢাকের শব্দ শোনা যাওয়ার আগেই শিউলির সুবাস যেন জানিয়ে দেয়, উৎসবের দিনগুলো খুব বেশি দূরে নেই।

শুধু গ্রাম কিংবা মফস্বল নয়, শহরের বিভিন্ন জায়গাতেও এখনো শিউলির দেখা মেলে। পুরোনো বাড়ির আঙিনা, স্কুলের মাঠ, পার্ক কিংবা রাস্তার ধারে থাকা গাছের নিচে ভোরে পাওয়া যায় ঝরা শিউলি। তবে আগের মতো বড় বড় গাছ ও খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় অনেক শহুরে মানুষের কাছে শিউলি এখন হয়ে উঠেছে পুরোনো দিনের স্মৃতির মতো।

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শিউলির দেখা মেলে বেশি। এই সময়টায় শরতের আবহও ধীরে ধীরে বদলে যায়। বর্ষার ভেজাভাব কমে আসে, আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা বাড়ে, ভোরের বাতাসে আসে হালকা শীতলতা। এর মাঝেই শিউলির সুবাস শরতের উপস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

শিউলির জীবনও যেন খুব ছোট্ট এক গল্প। রাতে ফুটে ওঠা, ভোরে ঝরে পড়া। তারপরও সেই অল্প সময়েই চারপাশকে সুবাসিত করে যাওয়া। হয়তো এ কারণেই ফুলটি মানুষের মনে এত গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে। শিউলি মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য সবসময় দীর্ঘস্থায়ী হতে হয় না; কখনো কখনো ক্ষণিকের উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।

ক্যালেন্ডারে অক্টোবর এসেছে। শহরের ব্যস্ততা আগের মতোই চলছে, মানুষ ছুটছে নিজের কাজে। কিন্তু কোনো এক ভোরে গাছের নিচে হঠাৎ চোখে পড়বে সাদা-কমলা ফুলের স্তর। বাতাসে ভেসে আসবে পরিচিত সেই গন্ধ। তখন হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে যেতে ইচ্ছে করবে।

প্রকৃতি তখন নীরবে বলে উঠবে শরৎ এখনো বেঁচে আছে, শিউলির সুবাসে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি