https://bindubanglatv.com/
ডেস্ক রিপোর্ট :
নিজস্ব ঐতিহ্য, গান-কবিতা আর পিঠাপুলির উৎসবে মুখর সিজেএফডির হেমন্ত সন্ধ্যা
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ইট-পাথরের দেয়াল ভেদ করে হঠাৎ যেন ফিরে এসেছিল বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ আবহ। হিমেল হাওয়ার পরশ, নবান্নের পিঠাপুলির ঘ্রাণ, গান-কবিতার মায়াবী সুর আর প্রিয়জনদের প্রাণখোলা আড্ডায় একাকার হয়ে উঠেছিল সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি ও শেকড়ের টান। স্মৃতি, আবেগ আর ভালোবাসার এমনই এক অনন্য সন্ধ্যার নাম—কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকার ‘হেমন্ত সন্ধ্যা’।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর পরিবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এ আয়োজন পরিণত হয় কুমিল্লার সাংবাদিক, সংস্কৃতিপ্রেমী ও সুধীজনদের এক মিলনমেলায়। হেমন্তের আগমনী আবেশে সাজানো এ অনুষ্ঠানে ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিকতার কঠোরতা; বরং ছিল আত্মার টান, পারস্পরিক সম্প্রীতি আর শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক আন্তরিক আহ্বান।
কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকার সভাপতি সাঈদ আহমেদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন জসিম।
অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোহাম্মদ আলী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ড. নজরুল ইসলাম, জয়পুর হোমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম এফসিজিএ এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মিজানুর রহমান।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সিজেএফডির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুর রহমান খোকন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম ও এম মোশাররফ হোসাইন, হেমন্ত সন্ধ্যা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বেলাল এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমসহ বিশিষ্টজনেরা।
সন্ধ্যার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক আয়োজন। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী দিঠি আনোয়ারের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে যোগ করে বাড়তি আনন্দ। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী মনির হোসেন, শামীমা নাসরীন, হাফসা পলিন, রিজওয়ান কাদের কচি, রাশিদা রাশি, শারমীন সুলতানা রিনা, মহিন উদ্দিন স্বপন ও এসএ কিরণের পরিবেশনায় গানগুলো শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। বিশিষ্ট শিল্পী অর্জুন বিশ্বাসের জীবনভিত্তিক গান উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
আবৃত্তিশিল্পী সীমা ইসলাম, জুনান নাশিত ও দুলাল চৌধুরীর কণ্ঠে কবিতার পঙ্ক্তিমালা হেমন্তের সন্ধ্যায় ছড়িয়ে দেয় ভিন্ন এক আবেশ। ছড়াকার ও সাংবাদিক প্রণব কুমার মজুমদার এবং সালাম ফারুকের প্রাণবন্ত উপস্থিতি ও রসাত্মক উপস্থাপনায় পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত।
বিশেষ আকর্ষণ ছিল ‘সিন্দাবাদ শিল্পী গোষ্ঠী’র পরিবেশনা। কুমিল্লার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবগাথা নিয়ে তাদের পরিবেশিত গান উপস্থিত অতিথিদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজস্ব শেকড়ের কাছে। প্রবাসে কিংবা রাজধানীর ব্যস্ততায় থেকেও যে জন্মভূমির স্মৃতি ও ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ে অমলিন থাকে, এ পরিবেশনা যেন তারই আবেগঘন বহিঃপ্রকাশ।
হেমন্তের উৎসব পিঠাপুলি ছাড়া পূর্ণতা পায় কী করে! তাই বিকেল ৪টা থেকেই অনুষ্ঠানস্থলে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরির আয়োজন। ভাপা, চিতইসহ নানা ধরনের পিঠার ঘ্রাণে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। সদস্যদের পাশাপাশি পরিবার-পরিজনদের অংশগ্রহণ আয়োজনটিকে দেয় ভিন্ন মাত্রা। পিঠার স্বাদ, চায়ের আড্ডা আর পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ কথোপকথনে তৈরি হয় এক আন্তরিক পারিবারিক আবহ।
বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলা এ আয়োজন কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না; বরং পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে সাংবাদিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করা, নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির ঋতুভিত্তিক সংস্কৃতি তুলে ধরা এবং কুমিল্লার মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও গভীর করার এক সুন্দর প্রয়াস।
নগরজীবনের যান্ত্রিকতার ভিড়ে এমন আয়োজন মনে করিয়ে দেয়—মানুষ শুধু পেশা কিংবা পরিচয়ে বাঁচে না, বাঁচে স্মৃতি, সংস্কৃতি, বন্ধুত্ব আর শেকড়ের ভালোবাসায়। সিজেএফডির ‘হেমন্ত সন্ধ্যা’ তাই একটি সন্ধ্যার আয়োজন হয়েই থেমে থাকেনি; হয়ে উঠেছে হৃদয়ে জমা রাখার মতো এক টুকরো বাংলার গল্প।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে এমন মিলনমেলা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে।