https://bindubanglatv.com/
বিপ্লব সিকদার :
৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেবল একটি স্মরণীয় তারিখ নয়; এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর সেই ইতিহাসের সঙ্গে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে প্রায় ৬-৭ কিলোমিটারের সার্বভৌমত্ব পদযাত্রা। এই পদযাত্রার রাজনৈতিক তাৎপর্য শুধু একটি কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে আনার একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব, দলীয় বলয়ের আধিপত্য এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমন বাস্তবতায় তারেক রহমানের সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে দীর্ঘ পথ হাঁটা একটি প্রতীকী রাজনৈতিক পদক্ষেপ। নেতৃত্ব যখন মঞ্চের দূরত্ব কমিয়ে জনতার সঙ্গে একই পথে হাঁটে, তখন তার রাজনৈতিক বার্তা বক্তৃতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হতে পারে।
৭ নভেম্বর ২০২৬, বিকেল। রাজধানীর নয়াপল্টন থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রা কাকরাইল, হেয়ার রোড, মিন্টো রোড, বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পৌঁছায়। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের হিসাবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটেছেন। অন্য কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দূরত্ব প্রায় সাত কিলোমিটার উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ দূরত্বের হিসাবে সামান্য পার্থক্য থাকলেও দীর্ঘ পথজুড়ে তাঁর অংশগ্রহণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে মিল রয়েছে।
এই পদযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারেক রহমান শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন না; তিনি নিজেই জনতার সঙ্গে হেঁটেছেন। তাঁর সামনে ছিল না প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার দৃশ্যমান বলয়। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথ চলা, রাস্তার দুই পাশে অপেক্ষমাণ মানুষের অভিবাদনের জবাব দেওয়া—এসব দৃশ্য নেতৃত্বের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমানোর একটি রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করেছে।
‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ’—এই রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সার্বভৌমত্ব শোভাযাত্রার একটি আদর্শিক যোগসূত্র রয়েছে। এর মূল বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থ নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থের ভিত্তিতে।
এখানে সার্বভৌমত্বকে শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা কিংবা বিদেশি প্রভাবমুক্ত থাকার ধারণায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, সীমান্তের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাও সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক মর্যাদার ভারসাম্য রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, আবার কোনো দেশের কাছে নতজানু অবস্থানও নয়—এটাই হওয়া উচিত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি।
এই পদযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হচ্ছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত শক্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে নিহিত। কোনো স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা, গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি কিংবা জনগণের অধিকার হরণের অপচেষ্টা মোকাবিলায় জনগণের সচেতন ও শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক শক্তি।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল নির্ধারক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ৭ নভেম্বরের পদযাত্রা সেই জনসম্পৃক্ত রাজনীতির ধারণাকে নতুন করে সামনে আনার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, জনসমাগম মানেই জনসমর্থনের চূড়ান্ত পরিমাপ নয়। একটি সফল পদযাত্রা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর। ৭ নভেম্বরের প্রায় ছয়-সাত কিলোমিটারের সার্বভৌমত্ব পদযাত্রা একটি রাজনৈতিক দৃশ্যের চেয়েও বড় কিছু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তারেক রহমানের জনতার কাতারে হাঁটা নেতৃত্বের কাছে একটি বার্তা, আবার সাধারণ মানুষের কাছেও একটি প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
এখন দেখার বিষয়, রাজপথের এই জনসম্পৃক্ততার রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা প্রতিফলিত হয়। জনগণ শুধু নেতাকে পাশে নিয়ে হাঁটতে চায় না, তারা চায় অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচার।
কারণ সার্বভৌমত্বের প্রকৃত মালিক জনগণ। রাষ্ট্রের শক্তি জনগণ, রাজনীতির শক্তি জনগণ এবং গণতন্ত্রের চূড়ান্ত রক্ষাকবচও জনগণ। ৭ নভেম্বরের পদযাত্রা যদি এই সত্যকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলেই এই আয়োজন বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন বার্তা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।