https://bindubanglatv.com/
বৈষম্যমূলক নেতৃত্ব আজ আর কেবল নীতিগত বিতর্কের বিষয় নয়; এটি সরাসরি সমাজের প্রান্তিক স্তরে আঘাত হানছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো যখন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হয় এবং বাকিদের উপেক্ষা কিংবা দমনে পরিণত হয়, তখন রাজনীতির আদর্শিক মুখোশ খুলে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় রাজনীতি ক্রমেই ‘নগ্ন’ হয়ে উঠছে—যেখানে মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও অন্তর্ভুক্তির বদলে ক্ষমতা, লাভ ও নিয়ন্ত্রণই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বৈষম্যমূলক নেতৃত্বের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসমতা। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা নেতৃত্ব যখন নীতিনির্ধারণে সমাজের সব স্তরের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও কার্যত অদৃশ্য হয়ে পড়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক খাতে এই বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উন্নয়ন প্রকল্পের ভাষ্যে “সবার জন্য” শব্দটি থাকলেও বাস্তবে তার সুফল সীমিত থাকে নির্দিষ্ট শ্রেণি বা অঞ্চলের মধ্যে।
এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকও। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে অবমূল্যায়ন করা হয়, কখনো আবার রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হয়। নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ক্ষমতায় গেলে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায়বদ্ধতা দেখা যায় না। ফলে রাজনীতি মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধানকারী শক্তি না হয়ে ওঠে এক ধরনের প্রদর্শনীতে—যেখানে কথার ফুলঝুরি আছে, কিন্তু কার্যকর পরিবর্তন নেই।
রাজনীতির এই নগ্নতা আরও স্পষ্ট হয় যখন রাষ্ট্রযন্ত্র বিরোধী কণ্ঠ দমনে সক্রিয় হয়। ভিন্নমতকে দেশদ্রোহ বা বিশৃঙ্খলার তকমা দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক চর্চাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন বা দাবি তখন ‘আইনশৃঙ্খলার সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত হয়, অথচ তাদের সমস্যার মূল কারণ—বৈষম্যমূলক নীতি ও অবহেলা—অস্পর্শিতই থেকে যায়।
মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বাস্তবতাকে একদিকে উন্মোচন করছে, অন্যদিকে কখনো কখনো বিভ্রান্তিও ছড়াচ্ছে। ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রিত বয়ান প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠকে ঢেকে দেয়, ফলে সত্য আংশিকভাবে উপস্থাপিত হয়। তবু বিকল্প প্ল্যাটফর্ম ও নাগরিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রান্তিক অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই দৃশ্যমানতাই প্রমাণ করে যে সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয়; এটি কাঠামোগত।
বৈষম্যমূলক নেতৃত্বের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ। সামাজিক আস্থা ভেঙে পড়ে, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্ষয় হয়। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিকে নৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে না দেখে ক্ষমতার খেলায় পরিণত হতে দেখে হতাশ হয়। এর ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমে যায়, যা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে তাদের কণ্ঠের মূল্য নেই, তখন তারা হয় নীরব থাকে, নয়তো চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে—উভয়ই সমাজের জন্য বিপজ্জনক।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠে: বিকল্প কী? প্রথমত, নেতৃত্বকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। নীতিনির্ধারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাস্তব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ছাড়া বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা জোরদার করতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন দরকার—যেখানে বিরোধিতা শত্রুতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।সবশেষে বলা যায়, বৈষম্যমূলক নেতৃত্ব রাজনীতির মুখোশ খুলে দিয়েছে। এই নগ্নতা অস্বস্তিকর হলেও এটি একটি সুযোগও বটে—নিজেদের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করার সুযোগ। যদি এই বাস্তবতা অস্বীকার করা হয়, তবে প্রান্তিকের ক্ষত আরও গভীর হবে। আর যদি তা স্বীকার করে ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের পথে হাঁটা যায়, তবে রাজনীতি আবারও মানুষের আশা ও আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
লেখক – ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মাসিক বনফুল, বিন্দুবাংলা টিভি।