ঢাকা   ০১:১৮:১৫ পিএম, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শব্দহীন কান্নায় জর্জরিত মেঘনার জেলেপল্লীর জীবনসংগ্রাম

বিপ্লব সিকদার
  • Update Time : Friday, April 10, 2026,
  • 665 Time View

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা মেঘনা ও কাঠালিয়া নদী বেষ্টিত এই জনপদ একসময় ছিল পেশাদার জেলেদের প্রাণকেন্দ্র। নদীর স্রোত, জালের শব্দ আর ভোরের কুয়াশা ভেদ করে মাছ ধরার দৃশ্য ছিল এখানকার দৈনন্দিন জীবনচিত্র। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই চিত্র এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জেলেপল্লীগুলো আজ নীরব বেদনায় ডুবে আছে।
উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের সোনার চর গ্রামের কাগকান্দা, জয়নগর, চন্দনপুর ইউনিয়নের তুলাতুলি, বড়কান্দা ইউনিয়নের দুর্গাপুর এবং রাধানগর ইউনিয়নের তালতলি—এমন বহু গ্রামে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছেন প্রাচীন এই জেলে সম্প্রদায়। তাদের অধিকাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী, যাদের পূর্বপুরুষেরা যুগ যুগ ধরে নদীকেন্দ্রিক জীবনধারার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় এই নদীগুলোই ছিল তাদের জীবিকার একমাত্র উৎস। কিন্তু বর্তমানে নদীতে মাছের প্রাপ্যতা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রভাবশালীদের অবৈধ দখল ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকার। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বছরের পর বছর নদীর গুরুত্বপূর্ণ অংশে ঝোপ তৈরি করে এবং সূক্ষ্ম জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ আহরণ করছেন। এতে করে প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং ছোট মাছ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
ফলে প্রকৃত জেলেরা তাদের নিজস্ব উদ্যোগে মাছ ধরা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছেন না। অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন—কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক, আবার কেউবা ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। তবুও একটি বড় অংশ এখনো দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার ক্ষেত্রেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় জেলেদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে সরকারের দেওয়া সহায়তার তালিকায় তাদের নাম ব্যবহার করা হলেও প্রকৃত সুবিধা তারা পান না। বরং প্রভাবশালীরা সেই সুবিধা আত্মসাৎ করেন। ফলে সরকারি উদ্যোগগুলো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে।
একজন জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আমরা অভিযোগ করতেও ভয় পাই। যারা অন্যায় করে, তারাই সব জায়গায় প্রভাবশালী। না পেয়ে বলতে হয় পেয়েছি—এইটাই আমাদের বাস্তবতা।”
সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। কিছু পরিবার সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে আর্থিকভাবে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও অধিকাংশ পরিবারই এখনও মানবেতর জীবনযাপন করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।দিনে লোকালয়ে স্বাভাবিক হাসিমুখে চলাফেরা করলেও রাত নামলেই যেন এই পল্লীগুলোতে নেমে আসে এক অদৃশ্য বিষণ্নতা। নিঃশব্দে জমে ওঠে বঞ্চনার কান্না, যা কেউ শোনে না, কেউ দেখতে পায় না।এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল। নদী দখল ও অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রকৃত জেলেদের সুরক্ষা এবং সরকারি সহায়তার সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।এটি কোনো গল্প নয়, কোনো কাল্পনিক কাহিনিও নয় এটাই মেঘনা উপজেলার জেলেদের বাস্তব জীবনচিত্র। যেখানে নদী আছে, কিন্তু মাছ নেই; জীবিকা আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই; মানুষ আছে, কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর নেই।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি