কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা-র চন্দনপুর ইউনিয়নের তুলাতুলি গ্রামে রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষে দেলোয়ার হোসেন দেলা (৩২) নিহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় জনমনে আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।গত শনিবার দিবাগত গভীর রাতে সংঘটিত এ ঘটনায় আহত হয়েছেন উভয় গ্রুপের ৪ জন। তবে স্থানীয়দের দাবি, এটি কেবল রাস্তার কাজ নিয়ে বিরোধ নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্য, ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে জমে থাকা উত্তেজনার বিস্ফোরণ।স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তুলাতুলি গ্রামে চলমান একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ ও শ্রমিক নিয়োগ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই স্থানীয় ইউপি সদস্য, চন্দন পুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি নাছির গ্রুপ ও জামায়াত পন্থী নেতা বাতেন গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলছিল। উভয় পক্ষের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একে অপরকে উদ্দেশ্য করে পাল্টাপাল্টি পোস্ট ও হুমকিমূলক বক্তব্য দিতে থাকে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও স্থানীয়ভাবে কোনো কার্যকর সমঝোতা উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত শনিবার স্থানীরা রাতে সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও তা আর সম্ভব হয়নি বরং দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। ফলে
শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে দুই পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র, রামদা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এসময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন জামায়াত নেতা আব্দুল বাতেন মৃধার ভাই দেলোয়ার হোসেন দেলা। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে নাছির মেম্বার ও তার শ্যালক হালিমের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। তাদের ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আরও কয়েকজন আহত ব্যক্তি স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের নাম জানা সম্ভব হয়নি। নাছিরের নামে আগেও মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
রাজনৈতিক বিভাজনের অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সংঘর্ষে জড়িত দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন দীর্ঘদিনের। একপক্ষ স্থানীয়ভাবে জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত, অপরপক্ষ যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, রাস্তার কাজের তদারকি এবং স্থানীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠা—এসব বিষয় ধীরে ধীরে দ্বন্দ্বকে সহিংসতায় রূপ দেয়। কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “এলাকায় রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন পর্যায়ে গেছে যে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘাতে জরিয়ে পরছে। মাদকের আগ্রাসন রুখতে না পারলে আরও সংঘাতের আশঙ্কা।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ
নিহত দেলোয়ারের স্বজনদের দাবি, তাকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের এক সদস্য বলেন, “দেলোয়ারকে আগে থেকেই হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। রাস্তার কাজ ছিল শুধু বাহানা।”
নাছির মেম্বার এর পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মেঘনা থানা-র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলাম জানান, “দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।”তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ছোটখাটো সংঘর্ষ, মহড়া ও প্রকাশ্য হুমকির ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বিরোধ ধীরে ধীরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সামাজিক অস্থিরতার ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, মেঘনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভক্তি এখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক গ্রুপিং এবং আধিপত্যের রাজনীতি সংঘাত বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে ইউনিয়নভিত্তিক ঠিকাদারি, রাস্তা নির্মাণ, বালু ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ছে।এদিকে নিহতের ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো সময় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।