মেঘনায় স্ত্রীকে ঘিরে স্বর্ণ, নগদ অর্থ ও রহস্যজনক অন্তর্ধান নিয়ে তোলপাড়
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার মানিকারচর ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে প্রবাসী স্বামীর পাঠানো লাখ লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে গড়া সঞ্চয়, জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন—সবকিছুই এখন ভেঙে পড়েছে বলে দাবি করেছেন প্রবাসী মো. ফারুক মিয়া। অভিযোগ উঠেছে, দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখেই একদিকে টাকা নেওয়া, অন্যদিকে গোপনে ডিভোর্স কার্যকর এবং পরবর্তীতে সন্তান রেখে বাড়ি ত্যাগের মতো ঘটনা ঘটেছে।স্থানীয় সূত্র, অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাধবপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. ফারুক মিয়া প্রায় এক যুগ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। ২০১৮ সালের ১৫ মে পারিবারিকভাবে গোবিন্দপুর গ্রামের মুক্তা আক্তারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় স্বর্ণালঙ্কার দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তীতে সংসার গুছিয়ে নিতে বিদেশ থেকে ধাপে ধাপে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠান তিনি।ফারুক মিয়ার দাবি, জমি ক্রয়, ঘর নির্মাণ ও ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের কথা বলে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা এবং অন্তত ১৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার স্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু সম্প্রতি দেশে ফিরে তিনি দেখেন, পাঠানো অর্থের সুস্পষ্ট কোনো হিসাব নেই। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, দেশে ফেরার একদিন পরই সাত বছর বয়সী কন্যা সন্তানকে বাড়িতে রেখে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে যান তার স্ত্রী। পরে অনুসন্ধান করে তিনি জানতে পারেন, চলতি বছরের মার্চ মাসেই তাকে ডিভোর্স দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই সময়ের পরও বিভিন্ন অজুহাতে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, বিষয়টি প্রথমে পারিবারিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। পরে ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়ার মাধ্যমে সালিশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অভিযুক্ত পক্ষ উপস্থিত হয়নি। এতে ঘটনাটি আরও রহস্যজনক হয়ে ওঠে। সালিশ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, অভিযুক্ত পরিবারের পক্ষ থেকে পরে জানানো হয়—‘ এক সেনা কর্মকর্তার পরিচিত এক আত্মীয় বিষয়টি দেখভাল করছেন। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় বা ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।এদিকে অভিযোগকারী ফারুক মিয়া দাবি করেন, থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ সরাসরি মামলা না নিয়ে প্রথমে নিখোঁজ ডায়েরি করার পরামর্শ দেয়। পরে তিনি একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও লিখিত অভিযোগ জমা দেন। তার ভাষ্য, “আমি বিদেশে কষ্ট করে টাকা পাঠাইছি। এখন স্ত্রীও নাই, টাকাও নাই। আমার সন্তানের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।”
তবে পুলিশ বলছে, অভিযোগটি মূলত পারিবারিক ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত হওয়ায় তাৎক্ষণিক ফৌজদারি মামলা নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত উপাদান প্রাথমিকভাবে পাওয়া যায়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, স্বর্ণ ও টাকার দাবির পক্ষে ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে। অভিযুক্ত নারীর অবস্থান শনাক্তের চেষ্টাও চলছে।অন্যদিকে অভিযুক্ত মুক্তা আক্তারের পরিবার অভিযোগগুলোকে “একপাক্ষিক” বলে দাবি করেছে। মুক্তা আক্তারের মা শেফালী বেগম বলেন, “সংসারে আগে থেকেই সমস্যা ছিল। ফোনে প্রায়ই ঝগড়া হতো। টাকার যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো অতিরঞ্জিত।” স্বর্ণালঙ্কারের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সংসারের প্রয়োজনেই অনেক কিছু বিক্রি বা খরচ হয়েছে।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ নিয়ে পারিবারিক বিরোধ, গোপন ডিভোর্স ও সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর দূরত্ব, আর্থিক নিয়ন্ত্রণের অস্বচ্ছতা এবং সামাজিক জবাবদিহির অভাবে এমন বিরোধ বাড়ছে। তবে এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তারা।