• সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

মব সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে প্রান্তিকে

বিপ্লব সিকদার / ৫৩ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

মানুষের সভ্যতার ইতিহাস যতটা আইন, রাষ্ট্র ও শৃঙ্খলার গল্প—ততটাই এটি জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ ও প্রতিশোধেরও ইতিহাস। প্রান্তিক সমাজে “মব সংস্কৃতি” বা জনতার বিচার নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি বহু পুরোনো সামাজিক বাস্তবতার ধারাবাহিকতা। রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হলে, বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে গেলে কিংবা সামাজিক বৈষম্য চরমে পৌঁছালে মানুষ বারবার নিজের হাতে বিচার তুলে নিয়েছে। ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও সমসাময়িক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, মব সংস্কৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এক জটিল সামাজিক প্রবণতা।
প্রাচীন সমাজে যখন আধুনিক রাষ্ট্র বা লিখিত আইন ছিল না, তখন বিচার ছিল মূলত সামষ্টিক। গোত্র বা গ্রামভিত্তিক সমাজে অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করত পুরো সম্প্রদায়। গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক আইনি কাঠামোর আগেই “কমিউনাল জাস্টিস” ছিল প্রধান মাধ্যম, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করত জনসমষ্টি । এই প্রেক্ষাপটে মব সংস্কৃতির শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্র গড়ে উঠলেও প্রান্তিক অঞ্চলে এই মানসিকতা পুরোপুরি বিলীন হয়নি।

ইতিহাসে “লিঞ্চিং” নামে পরিচিত এক ধরনের মব বিচার বিশেষভাবে আলোচিত। এটি এমন এক সহিংসতা, যেখানে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই জনতা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়, কখনও হত্যা পর্যন্ত করে । এই ঘটনা শুধু একটি দেশের নয়; বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সময়েই এমন প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন দুর্বল বা অনুপস্থিত, সেখানে জনতার বিচারই হয়ে ওঠে দ্রুততম প্রতিক্রিয়া।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মব সহিংসতা হঠাৎ করে জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অবিশ্বাস। কোনো একটি ঘটনা—যেমন অপরাধ, গুজব, রাজনৈতিক উত্তেজনা বা পুলিশি ব্যর্থতা—এই জমে থাকা আবেগকে বিস্ফোরিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, গুজব, দলগত আবেগ, ব্যক্তিসত্তার বিলুপ্তি এবং “গ্রুপ মাইন্ড” বা দলগত মানসিকতা মানুষের আচরণকে দ্রুত সহিংস করে তোলে । ফলে ব্যক্তি হিসেবে যে মানুষ শান্ত, সে-ই জনতার অংশ হয়ে ভয়াবহ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।

প্রান্তিক সমাজে এই প্রবণতা আরও তীব্র। কারণ সেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি সীমিত, বিচার পেতে সময় লাগে, আর সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল। ফলে মানুষ মনে করে—তাৎক্ষণিক শাস্তিই ন্যায়বিচার। এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যখন বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়, তখনই মব জাস্টিস বেড়ে যায় । বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

মব সংস্কৃতির পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নৈতিক ক্ষোভ। সমাজে যখন কোনো অপরাধকে “নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য” হিসেবে দেখা হয়, তখন মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। এক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভয়, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের অনুভূতি মানুষকে সংগঠিত করে সহিংসতায় ঠেলে দেয়, যা এক ধরনের “ভিজিল্যান্টি রিচুয়াল” বা প্রতিশোধমূলক সামাজিক আচারে রূপ নেয় । এই প্রক্রিয়ায় সহিংসতা শুধু শাস্তি নয়, বরং একটি প্রতীকী প্রদর্শন—যেখানে জনতা নিজেদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

তবে মব সংস্কৃতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর অনিশ্চয়তা ও অনিয়ন্ত্রিত চরিত্র। এখানে বিচার হয় আবেগের ভিত্তিতে, প্রমাণের ভিত্তিতে নয়। ফলে নিরপরাধ মানুষও শিকার হয়। গুজব বা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে থামানো কঠিন হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সামাজিক বিভাজন, প্রতিশোধের চক্র এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করে।
আধুনিক যুগে প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মব সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আগে একটি ঘটনা সীমিত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও, ছবি বা গুজব দ্রুত মানুষের আবেগ উস্কে দেয়, ফলে জনতা আরও দ্রুত সংগঠিত হয়। এতে প্রান্তিক এলাকার মব সহিংসতা কখনও জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে আসে, কিন্তু বাস্তবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা ততটা শক্তিশালী হয় না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মব সংস্কৃতি একদিকে সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিলম্ব, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এসব কারণে সাধারণ মানুষ কখনও কখনও নিজেরাই বিচারক হয়ে ওঠে। কিন্তু এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত সমাজকে আরও অস্থির করে তোলে।
মব সংস্কৃতি তাই শুধুমাত্র একটি অপরাধমূলক আচরণ নয়; এটি একটি সামাজিক সংকেত। এটি জানিয়ে দেয় কোথায় রাষ্ট্র ব্যর্থ, কোথায় সমাজে আস্থা কমেছে, কোথায় মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছে। প্রান্তিক অঞ্চলে এই সংকেত আরও জোরালো, কারণ সেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
সমাধানের জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক উদ্যোগ। শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; প্রয়োজন বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা, দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করা, এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো। পাশাপাশি গুজব প্রতিরোধ ও তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হলো যুক্তিবোধ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন