• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১০:৩৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

কর্তৃত্ববাদী সংগঠক সংগঠনের জন্য মারাত্মক হুমকি

বিপ্লব সিকদার / ৪৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

সংগঠন মানেই সমষ্টির শক্তি, মতের বহুমাত্রিকতা এবং অংশগ্রহণের এক জীবন্ত প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন সেই সংগঠনের নেতৃত্ব ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী চরিত্র ধারণ করে, তখন সেই সমষ্টিগত শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের ভেতরের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—কর্তৃত্ববাদী সংগঠকের উত্থান একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। এটি শুধু নেতৃত্বের সংকট নয়, বরং সংগঠনের অস্তিত্বের জন্যই এক বড় ধরনের হুমকি।
কর্তৃত্ববাদী সংগঠক বলতে এমন এক নেতৃত্বকে বোঝানো হয়, যিনি সংগঠনের সব সিদ্ধান্ত নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান এবং অন্যদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। এই ধরনের নেতৃত্বে সাধারণত আনুগত্যকে যোগ্যতার চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া হয়। ফলে সংগঠনের ভেতরে একটি ভয়ভিত্তিক সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে সংগঠনের স্বাভাবিক গতিশীলতা নষ্ট করে দেয়।সংগঠনের মূল শক্তি হচ্ছে তার কর্মী বা সদস্যরা। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের কারণে এই কর্মীরাই একসময় নিজেকে অবমূল্যায়িত মনে করতে শুরু করে। তারা বুঝতে পারে, তাদের মতামতের কোনো মূল্য নেই, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। এতে করে তাদের মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়, যা পরবর্তীতে নিষ্ক্রিয়তায় রূপ নেয়। একজন সক্রিয় কর্মী যখন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন সংগঠন তার প্রকৃত শক্তি হারাতে থাকে।
একটি সুস্থ সংগঠনে নেতৃত্ব এবং কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা থাকে। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী সংগঠক সেই আস্থার জায়গাটিকে নষ্ট করে দেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন না যে অন্যরা ভালো সিদ্ধান্ত দিতে পারে। ফলে তিনি সবকিছু নিজের হাতে রাখতে চান। এই মানসিকতা নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে। কর্মীরা ধীরে ধীরে নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সংগঠনের প্রতি তাদের আবেগগত সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়।
কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের আরেকটি বড় সমস্যা হলো সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। একটি সংগঠন তখনই এগিয়ে যায়, যখন সেখানে নতুন চিন্তা, নতুন ধারণা এবং নতুন উদ্যোগের জায়গা থাকে। কিন্তু যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া হয়, সেখানে নতুন কিছু ভাবার সুযোগ থাকে না। কর্মীরা তখন শুধু নির্দেশ পালনকারী হয়ে দাঁড়ায়। এতে সংগঠন একটি যান্ত্রিক কাঠামোয় পরিণত হয়, যেখানে প্রাণ নেই, গতি নেই।এ ধরনের নেতৃত্ব সংগঠনের ভেতরে বিভক্তিও সৃষ্টি করে। যখন কিছু মানুষ বিশেষ সুবিধা পায় এবং অন্যরা বঞ্চিত হয়, তখন ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ জমতে থাকে। এই অসন্তোষ একসময় গ্রুপিং, দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। ফলে সংগঠনের ঐক্য ভেঙে পড়ে। একটি সংগঠন যখন ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে যায়, তখন বাইরের কোনো শক্তির প্রয়োজন হয় না তাকে ধ্বংস করার জন্য।
কর্তৃত্ববাদী সংগঠক সাধারণত সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। তিনি মনে করেন, তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং প্রশ্নাতীত। ফলে কেউ যদি কোনো গঠনমূলক সমালোচনা করে, তাকে বিরোধী বা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই প্রবণতা সংগঠনের ভেতরে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। কেউ আর সত্য কথা বলতে সাহস পায় না। এতে করে ভুল সিদ্ধান্তগুলো সংশোধনের সুযোগ থাকে না, বরং ভুলগুলো আরও বড় আকার ধারণ করে।
বর্তমান বিশ্বে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো একটি সংগঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। কারণ পরিবর্তন মানেই নতুন চিন্তা, নতুন পদ্ধতি এবং নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা—যা তার একক কর্তৃত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তিনি পরিবর্তনকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। এতে করে সংগঠন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হয় এবং ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে।
অনেকে মনে করেন, কঠোর নেতৃত্ব সংগঠনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখে। কিছু ক্ষেত্রে এটি আংশিক সত্য হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই কঠোরতা সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এটি মানুষকে ভয়ভীতির মধ্যে রাখে, তাদের স্বাভাবিক কাজের গতি কমিয়ে দেয় এবং সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে। একটি সংগঠন যদি শুধু শৃঙ্খলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু সেখানে মানবিকতা ও অংশগ্রহণ না থাকে, তাহলে সেই সংগঠন কখনোই টেকসই হতে পারে না।কর্তৃত্ববাদী সংগঠকের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি নিজেকে অপরিহার্য মনে করেন। তিনি মনে করেন, তাকে ছাড়া সংগঠন চলতে পারবে না। এই ধারণা থেকে তিনি বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি হতে দেন না। ফলে সংগঠনের ভেতরে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়। যখন কোনো কারণে সেই নেতা অনুপস্থিত হয়ে যান, তখন সংগঠন দিশেহারা হয়ে পড়ে।এই বাস্তবতায় একটি সংগঠনকে টিকে থাকতে হলে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নেতৃত্বকে হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, যেখানে সবার মতামতকে মূল্য দেওয়া হবে। সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কর্মীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হবে এবং তাদের ক্ষমতায়ন করতে হবে। যোগ্যতা ও ত্যাগকে মূল্যায়ন করতে হবে, আনুগত্যকে নয়।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন