ঢাকা   ০২:১৪:৪৭ পিএম, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেগ-আবেগ-যতির ভারসাম্যহীনতায় বদলে যাচ্ছে সমাজ

বিপ্লব সিকদার
  • Update Time : Wednesday, June 3, 2026,
  • 231 Time View

মানুষের জীবন যেন তিনটি শব্দের ওপর দাঁড়িয়ে আছে— বেগ, আবেগ ও যতি। বেগ মানুষকে এগিয়ে নেয়, আবেগ তাকে অনুপ্রাণিত করে, আর যতি তাকে ভাবতে শেখায়। কিন্তু আধুনিক সমাজে এই তিনটির ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে দেখা দিচ্ছে নানামুখী সংকট।একসময় গ্রামের জীবন ছিল ধীর-স্থির। মানুষের মধ্যে ছিল পারস্পরিক যোগাযোগ, সামাজিক বন্ধন এবং চিন্তা-ভাবনার জন্য পর্যাপ্ত সময়। কিন্তু প্রযুক্তির বিস্তার, প্রতিযোগিতামূলক জীবনব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে মানুষের জীবনে বেগ বেড়েছে বহুগুণ। সেই বেগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আবেগের প্রকাশ। অথচ কমে গেছে যতি— অর্থাৎ থেমে চিন্তা করার অভ্যাস।
বেগের প্রতিযোগিতায় মানুষ
দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এখন দ্রুততার প্রতিযোগিতা। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতি— সবখানেই এগিয়ে যাওয়ার চাপ। অভিভাবকরা সন্তানদের শৈশবেই প্রতিযোগিতার দৌড়ে নামিয়ে দিচ্ছেন। কর্মজীবীরা সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্যও চলছে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দ্রুততার এই সংস্কৃতি মানুষকে কর্মক্ষম করলেও মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। মানুষ সাফল্য অর্জন করছে, কিন্তু হারাচ্ছে মানসিক প্রশান্তি।
আবেগের বিস্ফোরণ
ডিজিটাল যুগে আবেগের প্রকাশও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। একটি ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় প্রতিক্রিয়ার ঝড়। অনেক সময় তথ্য যাচাই না করেই মানুষ আবেগের বশে মতামত দেয়, শেয়ার করে বা সিদ্ধান্ত নেয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক সংঘাত এমনকি রাজনৈতিক উত্তেজনার ক্ষেত্রেও আবেগনির্ভর আচরণ বাড়ছে। যুক্তির চেয়ে আবেগকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আবেগ মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আবেগ যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তবে তা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
হারিয়ে যাচ্ছে যতি
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— মানুষ থামতে ভুলে যাচ্ছে। ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং অবিরাম তথ্যপ্রবাহের কারণে আত্মসমালোচনা ও আত্মবিশ্লেষণের সময় কমে গেছে।
একসময় সন্ধ্যার পর পরিবারে আলোচনা হতো, বই পড়া হতো, সামাজিক যোগাযোগ হতো। এখন সেই সময় দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোনের পর্দা। মানুষ তথ্য পাচ্ছে, কিন্তু ভাবার সুযোগ পাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতি হারিয়ে যাওয়ার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত, মানসিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতা বাড়ছে।
তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
অনুসন্ধানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তরুণদের জীবনে বেগ ও আবেগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। দ্রুত সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার চাপ তাদের মানসিকভাবে অস্থির করে তুলছে।
অনেকে রাতভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটায়, আবার অনেকে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যতি বা আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা তুলনামূলকভাবে কম।
রাজনীতি ও সামাজিক বাস্তবতা
রাজনীতিতেও বেগ ও আবেগের প্রভাব স্পষ্ট। দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতা এবং আবেগনির্ভর বক্তব্য অনেক সময় বাস্তব সমস্যার গভীরে যাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য আবেগ প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে থাকতে হবে দায়িত্ববোধ এবং যথাসময়ে যতি নিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়নের সক্ষমতা।
পরিবারে ভারসাম্য সংকট
পরিবারে সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণও এই ভারসাম্যহীনতা। কর্মব্যস্ততার বেগ, ব্যক্তিগত আবেগ এবং সময়ের অভাবে পারস্পরিক বোঝাপড়া দুর্বল হচ্ছে।
ফলে ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝিও বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা পরিবারে একসঙ্গে সময় কাটানো এবং খোলামেলা আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
উত্তরণের পথ

বেগ, আবেগ ও যতির মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এর জন্য প্রয়োজন—
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তথ্য যাচাই করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংযম আনা।
পরিবারে নিয়মিত আলোচনা ও সময় দেওয়া।
বই পড়া ও চিন্তাশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ।
আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তিনির্ভর আচরণের চর্চা।
ব্যস্ত জীবনের মাঝেও আত্মবিশ্লেষণের জন্য সময় বের করা।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি