ঢাকা   ১২:১১:৪৯ পিএম, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেঘনায় অটোরিকশারধাক্কায় শিশু ফাতেমার মৃত্যু, পাঁচ লাখ টাকার সালিস!

বিপ্লব সিকদার
  • Update Time : Saturday, June 6, 2026,
  • 267 Time View

“পুলিশ জানে না, মামলা হয়নি; দরিদ্র অটোচালকের মাথায় পাঁচ লাখ টাকার বোঝা”

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া এড়িয়ে স্থানীয়ভাবে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে সালিসের মাধ্যমে রফাদফার অভিযোগ উঠেছে। দুর্ঘটনায় নিহত শিশুর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে এখন ভিটেমাটি বিক্রির শঙ্কায় পড়েছেন দরিদ্র অটোরিকশাচালক বাহাউদ্দীন। অন্যদিকে পুরো ঘটনাটি সম্পর্কে কিছুই জানে না বলে দাবি করেছে মেঘনা থানা পুলিশ।ঘটনাটি গত ২১ মে মেঘনা উপজেলার বড়কান্দা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হরিপুর গ্রামে ঘটে। নিহত মোসা. ফাতেমা আক্তার (৫) ঢাকার ডেমরার মাতুয়াইল এলাকা থেকে নানাবাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। তার বাবা মো. জীবন মির্জা ও মা মোসা. আমেনা বেগম। এ বিষয়ে গত ২৯ মে শুক্রবার সালিশ বসে। স্থানীয় সূত্র ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খেলাধুলার একপর্যায়ে শিশুটি হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে একটি চলন্ত অটোরিকশার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত হয়। স্থানীয়রা তাকে দ্রুত মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ফাতেমার মৃত্যু হয়।ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এলেও দুর্ঘটনাটি নিয়ে কোনো থানায় অভিযোগ, জিডি কিংবা মামলা হয়নি। বরং স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গণ্যমান্যদের উদ্যোগে সালিস বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউপি সদস্য জামান, মকবুল হোসেনসহ কয়েকজন মাতব্বরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সালিসে অটোরিকশাচালক বাহাউদ্দীনকে নিহত শিশুর পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।অভিযুক্ত অটোরিকশাচালক বাহাউদ্দীন বলেন, “আমি গরিব মানুষ। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। আমার এক ছেলে, এক মেয়ে, স্ত্রী ও বৃদ্ধ মা রয়েছে। নিজের ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই।

 

ইতোমধ্যে ৯৫ হাজার টাকা জোগাড় করে দিয়েছি। এখন বাকি টাকা দিতে হলে ভিটেটা বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না। সালিসে আমাকে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে।”তিনি দাবি করেন, ঘটনাটি ছিল একটি দুর্ঘটনা। শিশুটি হঠাৎ দৌড়ে এসে অটোরিকশার সামনে পড়ে যায়। তারপরও মানবিক কারণে যা পেরেছেন দিয়েছেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য জামানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।তবে সালিসে উপস্থিত স্থানীয় ব্যক্তি মকবুল হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “দুই পক্ষের সম্মতিতে বসে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। সালিসে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।”এদিকে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মেঘনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “এই ঘটনা সম্পর্কে থানা পুলিশ কিছুই জানে না। কোনো পক্ষই আমাদের অবহিত করেনি। থানায় কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি।”আইনজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটলে তা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হলেও সেটি ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতি দেয় না। আবার দুর্ঘটনার প্রকৃতি, দায়-দায়িত্ব এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়ও যথাযথ তদন্ত ছাড়া নির্ধারণ করা কঠিন।স্থানীয়দের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, দুর্ঘটনাটি যদি নিছক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা হয়ে থাকে, তাহলে একজন দরিদ্র চালকের ওপর পাঁচ লাখ টাকার আর্থিক দায় চাপিয়ে দেওয়ার ভিত্তি কী? আবার অন্যদিকে নিহত শিশুর পরিবারও তাদের সন্তান হারানোর শোক ও ক্ষতির কথা তুলে ধরছে।ফলে হরিপুর গ্রামের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা এখন কেবল একটি শিশুর মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি গ্রামীণ সালিস, আইনি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি এবং ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ন্যায্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি