• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৩:২৮ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

ভাংতি নেই’ অজুহাতে ডাবল ফি: মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

নাঈম সিকদার / ৫৬ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

সরকারি হাসপাতাল জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে আসেন, তখন তাদের প্রত্যাশা থাকে স্বল্প খরচে সঠিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার। কিন্তু সেই সেবার দ্বারপ্রান্তেই যদি নির্ধারিত ফি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা শুধু একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং জনআস্থার সংকটও বটে।কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ স্থানীয় জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। অভিযোগটি নতুন নয়, বরং বহু বছরের পুরোনো। বহির্বিভাগে সরকার নির্ধারিত পাঁচ টাকার টিকিটের পরিবর্তে অনেক রোগীর কাছ থেকে দশ টাকা নেওয়া হয়। অতিরিক্ত পাঁচ টাকা ফেরত চাইলে শোনা যায় এক চিরচেনা উত্তর—“ভাংতি নেই”।
প্রশ্ন হলো, ভাংতি না থাকা কি কোনো সরকারি নীতি? নাকি এটি এমন একটি অজুহাত, যা বছরের পর বছর ধরে একটি অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছে?
মেঘনা উপজেলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, অনেকেই এই পরিস্থিতিকে এতটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছেন যে এখন আর প্রতিবাদ করেন না। কেউ কেউ মনে করেন, পাঁচ টাকা নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। আবার অনেকে বলেন, হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে তর্কে জড়াতে চান না। ফলে নীরবে অতিরিক্ত অর্থ দিয়েই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন তারা।
কিন্তু বিষয়টি কি সত্যিই মাত্র পাঁচ টাকার?
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি মোটেও ছোট নয়। প্রতিদিন যদি কয়েকশ রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসেন এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হয়, তাহলে সেই অর্থের পরিমাণ মাস শেষে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে পৌঁছাতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই অতিরিক্ত অর্থের হিসাব কোথায়? এটি কি সরকারি কোষাগারে জমা হয়? নাকি কোনো অদৃশ্য খাতে হারিয়ে যায়? জনমনে জন্ম নেওয়া এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল দর্শন। রাষ্ট্র দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করতে ভর্তুকি দেয়। সেই ব্যবস্থার মধ্যেই যদি নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে, তবে তা রাষ্ট্রীয় সেবার উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।মেঘনা উপজেলা নদীবেষ্টিত একটি জনপদ। এখানকার অনেক মানুষ নিম্ন আয়ের। চিকিৎসা নিতে এসে তাদের অনেককে যাতায়াত খরচ, ওষুধ কেনা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় বহন করতে হয়। সেখানে অতিরিক্ত পাঁচ টাকা হয়তো কারও কাছে তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু নীতিগতভাবে এটি জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করার শামিল।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগটি যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটি কোনো একদিনের ঘটনা নয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে একই চর্চা চলে আসছে। দীর্ঘ সময় ধরে একটি অনিয়ম চলতে থাকলে সেটি আর ব্যক্তিগত বিচ্যুতি থাকে না; বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তখন নতুন কর্মচারী আসে, পুরোনো কর্মচারী বদলি হয়, কিন্তু অনিয়মটি বহাল থাকে।
এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—তদারকি কোথায়? উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি কখনো বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে? রোগীদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা কি রয়েছে? সেবা ফি’র তালিকা কি দৃশ্যমান স্থানে টানানো আছে? আর থাকলেও তা কি বাস্তবে অনুসরণ করা হচ্ছে?সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা। বহির্বিভাগের টিকিট বিক্রিতে ডিজিটাল রসিদ চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি কাউন্টারে স্পষ্টভাবে ফি’র তালিকা প্রদর্শন করতে হবে। অভিযোগ বক্স, হটলাইন নম্বর এবং নিয়মিত অডিটের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে।
মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শুধু একটি হাসপাতাল নয়; এটি এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবন ও আশার কেন্দ্র। তাই এখানে সেবার মান, আর্থিক স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি হাসপাতালের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা।“ভাংতি নেই”—এই দুটি শব্দ হয়তো উচ্চারণে খুব সাধারণ। কিন্তু যদি এই অজুহাতের আড়ালে বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে সেটি সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এটি সুশাসনের প্রশ্ন, নৈতিকতার প্রশ্ন এবং জনগণের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।মেঘনার মানুষ জানতে চায়, সরকার নির্ধারিত ফি যদি পাঁচ টাকা হয়, তাহলে তারা কেন দশ টাকা দেবে? আর যদি অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তার জবাবদিহিতা কোথায়?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষারও অপরিহার্য দাবি।

 

লেখক, সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন