• শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৮:১১ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটোর জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির নতুন কমিটি ঘোষণা পদুয়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের মাঝে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে ত্রাণ সহায়তা প্রদান চীনে দুই সপ্তাহের বিনিময় কর্মসূচিতে ইতালীয় শিক্ষার্থীদের আগমন উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে যশোরে এক যুবক আটক চুনতি ইউনিয়ন বিএনপি পরিবারের পক্ষ থেকে মানবিক সহায়তা মাদকের বাপ-দাদাদের রুখতে না পারলে সমাজে মাদকের আগ্রাসন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে মেঘনায় মেয়েকে বাল্যবিয়ে দেওয়ায় মাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা সরকারি চলচ্চিত্র অনুদান বাছাই কমিটিতে বাচসাসের রাহাত সাইফুল অন্তর্ভুক্ত মেঘনায় স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত দুই বাঁশের সাঁকো মেঘনায় মাদকবিরোধী অভিযানে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে প্রেরণ

মাদকের বাপ-দাদাদের রুখতে না পারলে সমাজে মাদকের আগ্রাসন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে

বিপ্লব সিকদার / ১৫ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

মাদক শুধু একটি অবৈধ দ্রব্যের নাম নয়; এটি একটি সমাজ ধ্বংসের নীরব অস্ত্র। একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে গ্রাস করার সবচেয়ে ভয়ংকর মাধ্যমগুলোর একটি হলো মাদক। আজ দেশের শহর থেকে গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কর্মক্ষেত্র, এমনকি কিশোর-তরুণদের আড্ডাস্থল পর্যন্ত মাদকের ভয়াল ছোবল ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা প্রায়ই মাদকসেবীদের নিয়ে আলোচনা করি, ছোটখাটো বিক্রেতাদের গ্রেপ্তারের খবর দেখি, কিন্তু যারা এই ভয়ংকর ব্যবসার মূল হোতা, অর্থের জোরে বা প্রভাবের কারণে আড়ালে থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে— সেই ‘মাদকের বাপ-দাদাদের’ বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা অনেক সময়ই দৃশ্যমান হয় না। অথচ তাদের রুখতে না পারলে সমাজে মাদকের আগ্রাসন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
মাদক ব্যবসা কখনো এককভাবে পরিচালিত হয় না। এর পেছনে থাকে সংঘবদ্ধ চক্র, অর্থের শক্তি, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব, সীমান্তপথে চোরাচালান, দুর্নীতির সুযোগ এবং অপরাধী নেটওয়ার্ক। যারা মাঠপর্যায়ে মাদক বিক্রি করে, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বড় চক্রের ছোট অংশমাত্র। একজন বিক্রেতা ধরা পড়লেও কয়েক দিনের মধ্যে তার জায়গায় আরেকজন চলে আসে। কারণ, মূল পরিকল্পনাকারী এবং অর্থদাতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই শুধু খুচরা বিক্রেতাকে ধরে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন মূল হোতাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।
আজ অনেক পরিবারে দেখা যায়, মেধাবী সন্তান মাদকের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, কর্মক্ষম যুবক অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে, সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে, বাবা-মা সর্বস্ব হারিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন, কিন্তু সন্তানকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারছেন না। মাদক একজন মানুষকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিক, নৈতিক এবং সামাজিকভাবেও ধ্বংস করে দেয়। একজন মাদকাসক্ত নিজের জীবন নষ্ট করার পাশাপাশি পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজের জন্যও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
মাদকের সঙ্গে অন্যান্য অপরাধের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা—এসব অপরাধের পেছনে অনেক ক্ষেত্রেই মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা থাকে। মাদকের নেশা পূরণ করতে গিয়ে অনেক তরুণ এমন অপরাধ করে, যা হয়তো স্বাভাবিক অবস্থায় কখনোই করত না। ফলে মাদক কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। বিভিন্ন সময়ে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার হচ্ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছে বহু ব্যক্তি। এসব অভিযান অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায়, এত মাদক কোথা থেকে আসে? কারা অর্থায়ন করে? কারা নিরাপদে থেকে পুরো ব্যবসা পরিচালনা করে? যদি এই প্রশ্নগুলোর কার্যকর উত্তর এবং আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে অভিযান চললেও মাদক ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হবে না।
মাদকবিরোধী লড়াইকে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। পরিবারই একজন সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের জীবনযাপন করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তান হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ করছে, রাত করে বাসায় ফিরছে, অর্থের চাহিদা বেড়ে গেছে, পড়াশোনায় অনীহা তৈরি হয়েছে। এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সময়মতো সচেতনতা অনেক বড় বিপদ থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার শিক্ষা নয়, নৈতিক মূল্যবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সৃজনশীল চর্চার সুযোগ বাড়ালে তরুণদের একটি বড় অংশ মাদক থেকে দূরে রাখা সম্ভব।
সমাজের সচেতন মানুষদেরও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা উচিত নয়। নিজের এলাকায় কোথাও মাদক বিক্রি হলে বা কোনো চক্র সক্রিয় থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। তবে সেই সহযোগিতা যেন নিরাপদ উপায়ে হয় এবং তথ্যদাতার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হয়। একটি সমাজ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন অপরাধের বিরুদ্ধে সবাই একসঙ্গে অবস্থান নেয়।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে যদি কোনো মাদক কারবারি আইনের হাত থেকে রক্ষা পায়, তাহলে সেটি পুরো সমাজের জন্য ভয়ংকর বার্তা বহন করে। অপরাধী যদি মনে করে, তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা হবে না, তাহলে সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য, পক্ষপাত বা প্রভাব যেন কাজ না করে। আইন সবার জন্য সমান—এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সচেতনতামূলক প্রচার, সফল পুনর্বাসনের গল্প এবং মাদকের ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরার মাধ্যমে গণমাধ্যম সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচনও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। অনেকেই নেশার ফাঁদে পড়ে পরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। তাদের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। একজন সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষ সমাজের সম্পদে পরিণত হতে পারে।ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধও মাদক প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা হলে মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন, যুব সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।প্রযুক্তির এই যুগে মাদক ব্যবসার ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে।

 

লেখক – সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন