• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৬ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
মেঘনায় রতনপুর–তালতলী কাচা সড়ক কাদায় মরণফাঁদ, দুর্ভোগে হাজারো পথচারী অভিশপ্ত বন্যা থেকে মুক্তির পথ কি নেই? স্বচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই দূর হবে ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকট প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতে হবে নাঙ্গলমোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থীর বৃত্তি অর্জনে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা ঠাকুরগাঁও রোডে পূবালী ব্যাংকের বাংলা কিউআর বুথ উদ্বোধন মীর হেলালের নির্দেশনায় হাটহাজারীতে বন্যার্তদের পাশে ছাত্রদল নেতা তকিবুল বেনাপোল বন্দরে জব্দকৃত ৩ হাজার ৬৭৫ কেজি ভায়াগ্রা পাচারের শঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার গাইবান্ধায় ডিবির অভিযানে ৭০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের নির্বাচন ২৭ সেপ্টেম্বর

স্বচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই দূর হবে ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকট

বিপ্লব সিকদার / ৭ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন কোটি মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর এই মহানগর দেশের উন্নয়নের প্রতীক হলেও বর্ষা এলেই নগরবাসীর সামনে ভয়াবহ এক বাস্তবতা দেখা দেয়—জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর প্রধান সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার সামনে হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানি জমে যায়। এতে শুধু মানুষের চলাচল ব্যাহত হয় না; অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নগরজীবনের স্বাভাবিক ছন্দও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলাবদ্ধতা আজ আর কেবল একটি মৌসুমি দুর্ভোগ নয়, এটি ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল অবকাঠামো, সমন্বয়হীন প্রশাসন এবং জবাবদিহিতার অভাবের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকার জলাবদ্ধতার পেছনে বহু বছরের পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ অন্যতম প্রধান কারণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নগরের বিস্তার ঘটলেও সেই অনুপাতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল, জলাধার এবং পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বরং একের পর এক খাল, বিল, জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল ভরাট করে আবাসন, সড়ক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। আগে যেসব খাল বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে পৌঁছে দিত, সেগুলোর অনেকই আজ দখল, দূষণ কিংবা ভরাটের শিকার।
জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। রাজধানীর বহু এলাকায় পুরোনো ড্রেন সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও নির্মাণকাজের কারণে ড্রেন বন্ধ হয়ে আছে, আবার কোথাও নিয়মিত পরিষ্কার না করায় প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্যে ভরে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত প্রবাহিত হতে পারে না। সামান্য সময়ের ভারী বর্ষণেই পানি উপচে সড়কে উঠে আসে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো দিনের পর দিন স্থায়ী হয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নাগরিক অসচেতনতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, খাদ্যবর্জ্য এবং নির্মাণসামগ্রী ড্রেন ও খালে ফেলা হয়। এতে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। যদিও এ বিষয়ে আইন রয়েছে, কিন্তু তার কার্যকর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর অর্থনীতিতে প্রতিবছর বিপুল ক্ষতি হয়। যানজটে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়, শিল্পকারখানার উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয় এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। শিক্ষার্থীরা সময়মতো বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারে না। রোগীরা হাসপাতালে যেতে ভোগান্তিতে পড়েন। জরুরি সেবাও অনেক সময় ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তাদের বাসস্থানগুলো সাধারণত নিচু এলাকায় অবস্থিত।
স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও জলাবদ্ধতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে মশার বংশবিস্তার বৃদ্ধি পায়, ফলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দূষিত পানির সংস্পর্শে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পায়। শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা। ঢাকার প্রতিটি এলাকার ভূপ্রকৃতি, জনসংখ্যা, বৃষ্টিপাতের ধরন, পানি প্রবাহের দিক এবং ভবিষ্যৎ নগর সম্প্রসারণ বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। পরিকল্পনা তৈরির সময় প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, জলবিজ্ঞানী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বহু প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো কাজ শেষ হয়নি, ব্যয় বেড়েছে এবং কাঙ্ক্ষিত সুফলও পাওয়া যায়নি। তাই প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি, ঠিকাদারি কার্যক্রম এবং কাজের মান সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত তথ্য জানাতে হবে। উন্মুক্ত দরপত্র, ই-টেন্ডারিং, স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষা এবং সামাজিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করলে দুর্নীতি ও অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও কর্তব্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোনো প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে বা নিম্নমানের কাজ হলে তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংসদীয় তদারকি, গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে হবে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করলেও সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। সিটি করপোরেশন, রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা ও তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কাঠামোর মাধ্যমে কাজের পুনরাবৃত্তি, বিলম্ব ও দায়িত্বহীনতা কমানো সম্ভব।
প্রাকৃতিক খাল, জলাশয় ও জলাধার সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, খাল পুনরুদ্ধার, নিয়মিত খনন এবং পানি প্রবাহ সচল রাখতে হবে। নতুন আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের আগে পর্যাপ্ত জলাধার ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা মোকাবিলা আরও কার্যকর করা সম্ভব। স্মার্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, জিআইএসভিত্তিক মানচিত্র, সেন্সরের মাধ্যমে পানি পর্যবেক্ষণ, স্বয়ংক্রিয় পাম্পিং স্টেশন এবং বৃষ্টিপাতের আগাম পূর্বাভাসের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
নাগরিকদেরও দায়িত্ব কম নয়। ড্রেনে ময়লা না ফেলা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের যৌথ দায়িত্ব।
বিশ্বের অনেক শহর কার্যকর পরিকল্পনা ও সুশাসনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। বাংলাদেশও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান গ্রহণ করতে পারে। টেকসই নগর উন্নয়নের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য।

 

লেখক – সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন