খেলার কথা বলে বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ৬ বছরের শিশু তায়েবা। সন্ধ্যা পর্যন্ত সে না ফেরায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। তবে কোথাও সন্ধান মেলেনি। দুদিন পর প্রতিবেশীর সেপটিক ট্যাঙ্কের ভেতর পাওয়া যায় তার মরদেহ। প্রায় এক বছর আগে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যায়, শিশুটির পরিবারের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে আপন চাচি স্কুলশিক্ষিকা আয়েশা খাতুন তাকে হত্যা করেছেন। ধর্ষণের মতো আলামত থাকলেও পরীক্ষায় তার প্রমাণ মেলেনি।
সম্প্রতি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। পিবিআই গোপালগঞ্জের পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে। তদন্তে শিশুটির চাচি আয়েশা খাতুন, প্রতিবেশী শাহানাজ বেগম, রংমিস্ত্রি আসিফ ব্যাপারী ও নাছিমা বেগমের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
পিবিআই সূত্র জানায়, গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তায়েবা তার বাবা-মাকে বলে খেলার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। তখন পরিকল্পনা অনুযায়ী অপেক্ষায় থাকা আয়েশা তাকে প্রতিবেশী শাহানাজের বাড়ির লাকড়ির ঘরে নিয়ে যান।
শাহানাজের ভাষ্য অনুযায়ী, তায়েবাকে শোয়ানো অবস্থায় দেখতে পান তিনি। তখন আয়েশা শিশুটির দুই হাত এবং আসিফ দুই পা ধরে রেখেছিলেন। এরপর আয়েশা শাহানাজকে বলেন, তায়েবাকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে। শাহানাজ ডান হাত দিয়ে বাচ্চাকে কোলে ধরে রাখেন এবং বাম হাত দিয়ে গলা টিপে ধরেন। এতে শিশুটির মৃত্যু না হওয়ায় আয়েশা ঘটনাস্থলে থাকা একটি ব্লাউজ দিয়ে তায়েবার গলায় ফাঁস দেন। মৃত্যুর আগে শিশুটি চিৎকার করলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা নাছিমা ঘটনাস্থলে যান।
তিনি ঘরের দরজা থেকে উঁকি দিলে আয়েশা তাকে চলে যেতে বলেন। তিনি চলে যান। পরে আয়েশা ও আসিফ শিশুটির লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে হাত-পা ধরে টেনেহিঁচড়ে বের করার চেষ্টা চালান। বের করতে না পেরে লাশটি শাহানাজের টয়লেটের সেপটিক ট্যাঙ্কের কাছে নিয়ে রাখেন। আসিফ টয়লেটের ট্যাঙ্কের ঢাকনা খোলেন। আয়েশা শিশুটির কানের দুল খুলে শাহানাজের হাতে দেন। শেষে অয়েশা ও আসিফ মিলে লাশ ট্যাঙ্কের মধ্যে ফেলে দেন। পরদিন আয়েশার পরামর্শে শাহানাজ বাড়ি ছাড়েন। তায়েবার কানের দুল ১৮ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করে ঢাকায় চলে যান। আর নাছিমা ঘটনা জানার পরও বিষয়টি গোপন রাখেন।
এদিকে তায়েবাকে খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে শাহানাজের সেপটিক ট্যাঙ্কের ঢাকনা সরানো থাকায় লোকজনের সন্দেহ হয়। এরপর ঢাকনা পুরোপুরি সরিয়ে ভেতরে শিশুটির লাশ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে সখিপুর থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা বলা হয়। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. অমিত সেনগুপ্ত জানান, তায়েবাকে হত্যার সময় টানাহেঁচড়ার ফলে তার জননাঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত ও সতীচ্ছদ ফেটে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধর্ষণের শিকার হওয়ার মতো কোনো আলামত বা শুক্রাণু পাওয়া যায়নি।
তদন্তের বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, পৈতৃক বাড়ির সীমানা নিয়ে তায়েবার বাবা টিটু সরদার ও তাঁর ভাই শাহান সরদারের মধ্যে বিরোধ ছিল। হত্যার কিছুদিন আগে তুমুল ঝগড়ার এক পর্যায়ে তা হাতাহাতির দিকে যায়। ওই ঘটনার কয়েক দিন পর শাহান সরদার দুই ভাইয়ের বাড়ির মাঝে জোর করে দেয়াল নির্মাণ করেন। টিটু বাড়িতে এসে দেয়াল দেখতে পেয়ে তা ভেঙে ফেলেন। এর ফলে উভয় পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এসব নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকত। এরই মধ্যে শাহান ও আয়েশা দম্পতির বড় মেয়ে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে একটি ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যান। এ ঘটনা জানতে পেরে টিটু ও তাঁর স্ত্রী কটাক্ষমূলক কথাবার্তা বলতে থাকেন। এতে আয়েশা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের বড় রকমের ক্ষতির পরিকল্পনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি অন্যদের সহায়তায় তায়েবাকে হত্যা করেন। তদন্তে তাঁর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়া গেছে। গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।