দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড শুমারি কার্যক্রম নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। এর মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগীদের শনাক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে একটি ভালো উদ্যোগ তখনই সফল হয়, যখন মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন হয় দক্ষতা, সতর্কতা ও জবাবদিহির সঙ্গে। আর এখানেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবীদের অধিকতর প্রশিক্ষণের বিষয়টি।
বাংলাদেশে ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরির অভিজ্ঞতা নতুন নয়। ভোটার নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবায় শুরুতে তথ্য সংগ্রহের সময় অসতর্কতা ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে বহু নাগরিকের নাম, বয়স, ঠিকানা, পিতা-মাতার পরিচয় কিংবা অন্যান্য তথ্য ভুলভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। সেই ভুল সংশোধন করতে আজও অনেক মানুষকে সময়, অর্থ ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
একই ধরনের ভুল যদি ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতেও ঘটে, তাহলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। কারণ, এই তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, খাদ্য সহায়তা, কৃষি প্রণোদনা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অন্যান্য সরকারি সুবিধা নির্ধারিত হতে পারে। একটি ভুল মোবাইল নম্বর, ভুল এনআইডি, আয়ের ভুল তথ্য কিংবা পারিবারিক সদস্যসংখ্যার ভুল হিসাব একজন প্রকৃত উপকারভোগীকে দীর্ঘদিনের জন্য বঞ্চিত করতে পারে।
গ্রামের অনেক মানুষ এখনো ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন নন। অনেকেই জানেন না, কোন তথ্য কেন নেওয়া হচ্ছে কিংবা ভুল হলে কীভাবে তা সংশোধন করতে হবে। ফলে তথ্য সংগ্রহকারীর ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়। এ অবস্থায় যদি স্বেচ্ছাসেবীরা যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া মাঠে কাজ করেন, তাহলে অনিচ্ছাকৃত ভুল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
তাই শুধু নিয়োগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবীকে তথ্য সংগ্রহের কৌশল, তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি, নাগরিকের সঙ্গে আচরণ, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে হাতে-কলমে অধিকতর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তথ্য সংগ্রহ শেষে আবেদনকারীকে পূরণ করা তথ্য পড়ে শোনানো বা দেখিয়ে নিশ্চিত হওয়া, প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক সংশোধনের সুযোগ রাখা এবং পরবর্তী সময়ে সহজ প্রক্রিয়ায় বিনা খরচে তথ্য সংশোধনের ব্যবস্থা করাও জরুরি। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহকারীর ভুলের দায় যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের ওপর বর্তায় না—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সফলতা শুধু তথ্য সংগ্রহের সংখ্যার ওপর নয়, বরং তথ্যের নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে। তাই সরকারের উচিত এই কর্মসূচিকে তাড়াহুড়োর প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ডাটাবেজ নির্মাণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রথম শর্ত হলো—নিয়োগপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবীদের অধিকতর ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
আজকের সামান্য অবহেলা যেন আগামী দিনের লাখো মানুষের দুর্ভোগের কারণ না হয়। একটি ভুল তথ্যের দায় কোনো নিরীহ নাগরিকের কাঁধে চাপানো কখনোই ন্যায়সংগত নয়। দক্ষ স্বেচ্ছাসেবী, নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ এবং কার্যকর জবাবদিহিই পারে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণমূলক ও সফল উদ্যোগে পরিণত করতে।
লেখক : সাংবাদিক।