ঢাকা   ০১:১২:১২ পিএম, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া কুমিল্লার আলোকচ্ছটা

Reporter Name
  • Update Time : Tuesday, August 18, 2026,
  • 72 Time View

 

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর বিভাগের সাবেক সদস্য ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ট্যাক্স ক্যাডার থেকে এবারই প্রথম কোনো কর্মকর্তাকে দুদক কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।
সোমবার (১৭ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী তিনি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারকের সমপর্যায়ের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার এই নিয়োগ শুধু তার দীর্ঘ প্রশাসনিক ও পেশাগত জীবনের স্বীকৃতি নয়, বরং কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বাতাকান্দি গ্রামের জন্যও গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। তার নিয়োগের খবরে নিজ এলাকা থেকে শুরু করে কুমিল্লাজুড়ে তৈরি হয়েছে আনন্দ ও গর্বের আবহ।
ট্যাক্স ক্যাডার থেকে প্রথম কমিশনার
দুদকের বিভিন্ন পর্যায়ে ট্যাক্স ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা ডেপুটেশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে কমিশনার পদে ট্যাক্স ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তার নিয়োগের ঘটনা এবারই প্রথম। সেই ঐতিহাসিক নিয়োগের মাধ্যমে ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া দেশের রাজস্ব প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ে যুক্ত হলেন।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ট্যাক্স ক্যাডারে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে করনীতি, কর আইন, আর্থিক বিশ্লেষণ, অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা ক্ষেত্রে কাজ করেন। ২০২২ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য হিসেবে অবসর নেন তিনি।
রাজস্ব প্রশাসনে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ২০২৫ সালের ৪ মে তাকে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানেও আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি।
মেধা ও বহুমাত্রিক কর্মজীবন
ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার কর্মজীবনের শুরু সরকারি চাকরি দিয়ে নয়। ১৯৮৭ সালে আইসিবির সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরের বছর এবি ব্যাংক পিএলসিতে প্রভিশনারি অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ১৯৯১ সালে বিসিএস ট্যাক্স ক্যাডারে যোগ দিয়ে সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে রাজস্ব প্রশাসনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে অর্জন করেন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা।
শিক্ষাজীবনেও তার রয়েছে উজ্জ্বল কৃতিত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে বি.কম (সম্মান) এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বাতাকান্দি এসএসএএইচএম হাইস্কুলে। ১৯৭৯ সালে সেখান থেকে এসএসসি এবং ১৯৮১ সালে কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
উচ্চশিক্ষায়ও সম্পৃক্ততা
সরকারি চাকরির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার সম্পৃক্ততা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ও ফিন্যান্স বিভাগসহ ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি), স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
একজন ব্যাংকার, শিক্ষক, কর প্রশাসক, রাজস্ব বোর্ডের সদস্য এবং আর্থিক প্রতিবেদন তদারককারী প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান—বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন বিস্তৃত হয়েছে। এবার সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হলো দেশের দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
নতুন কমিশনের যাত্রা
একই প্রজ্ঞাপনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে দুদকের নতুন চেয়ারম্যান এবং ড. জাহাঙ্গীর আলম খানকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার পদত্যাগ করার পর নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। পরে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সদস্যসচিব করে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। সার্চ কমিটি ছয় দফা বৈঠক করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই ও যোগ্যতা পর্যালোচনা শেষে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে এ কে এম আসাদুজ্জামান, ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার নাম চূড়ান্ত করে।
কুমিল্লার জন্য নতুন গর্ব
তিতাসের বাতাকান্দি গ্রামের সন্তান থেকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক-আইনগত প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট কমিশনের সদস্য—ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার পথচলা স্থানীয় তরুণদের কাছেও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
একজন মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে ব্যাংকার, শিক্ষক, বিসিএস ট্যাক্স ক্যাডারের কর্মকর্তা, এনবিআরের সদস্য, এফআরসির চেয়ারম্যান হয়ে এবার দুদক কমিশনার—দীর্ঘ এই পথচলায় তার পেশাগত অভিজ্ঞতার পরিধি যেমন বিস্তৃত, তেমনি রয়েছে রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার নানা স্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা।
ট্যাক্স ক্যাডার থেকে প্রথম দুদক কমিশনার হিসেবে তার নিয়োগ তাই ব্যক্তিগত অর্জনের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রশাসনিক ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তিতাসের বাতাকান্দি থেকে উঠে আসা এই কৃতিসন্তানের নতুন দায়িত্ব কুমিল্লাবাসীর কাছে যেমন গর্বের, তেমনি দুর্নীতি দমন ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি