শহীদুল ইসলাম শরীফ:
নদীমাতৃক বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকা বাইচ। বর্ষার টলমলে নদীর বুকে সারি সারি নৌকা, শত শত মাঝির ছন্দময় বৈঠা আর ‘হেঁইও রে হেঁইও’ ধ্বনি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য লোকজ আবহ। সেই আবহেই শুক্রবার (২১ আগস্ট) দুপুরের পর ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কলাকোপায় ইছামতী নদীতে বসেছিল ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের আসর।
নৌকা বাইচকে ঘিরে সকাল থেকেই ছিল উৎসবের আমেজ। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইছামতীর দুই তীরে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। নদীর পাড়, আশপাশের বাড়ির ছাদ, গাছের ডাল এমনকি বাঁশের সাঁকোতেও জায়গা করে নেন দর্শনার্থীরা। কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ এসেছেন গ্রামীণ বাংলার হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখতে।
প্রতিযোগিতা শুরুর পরপরই বদলে যায় ইছামতীর দৃশ্যপট। ঢোলের বাদ্য, কাঁসার ঘণ্টা আর সারিগানের সুরে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়। প্রতিযোগী নৌকাগুলো যখন একসঙ্গে নদীর বুকে ছুটে চলে, তখন বৈঠার আঘাতে পানিতে তৈরি হয় ঢেউয়ের পর ঢেউ। মাল্লাদের সমস্বরে হেঁইও ধ্বনিতে উৎসবের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
প্রতিটি নৌকায় ছিলেন প্রায় ৪০ থেকে ৬০ জন মাল্লা। নির্দিষ্ট ছন্দে একসঙ্গে বৈঠা চালিয়ে তাঁরা নৌকাগুলোকে এগিয়ে নেন দুরন্ত গতিতে। কার নৌকা আগে যাবে—এ নিয়ে দর্শকদের মধ্যেও ছিল তুমুল উত্তেজনা। নদীর দুই পাড় থেকে ভেসে আসে করতালি ও উল্লাসধ্বনি।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্যেও গতি ও বৈঠার সমন্বয়ে এগিয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী নৌকা ‘লিটন ২’। শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেয় নৌকাটি। এর মধ্য দিয়ে এবারের কলাকোপা নৌকা বাইচে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ‘লিটন ২’।
নৌকা বাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, গ্রামীণ জনপদের মানুষের কাছে এটি উৎসব, বিনোদন ও সামাজিক মিলনমেলারও উপলক্ষ। নদীর দুই তীরে বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি প্রবীণদের চোখেমুখেও ছিল পুরোনো দিনের স্মৃতির ছাপ।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের ভিড়ে নৌকা বাইচের মতো লোকজ আয়োজন নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। নদী ও নৌকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাংলার জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্রও এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন করে সামনে আসে।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের মতে, কলাকোপার নৌকা বাইচ কোনো একটি দলের জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বছরের পর বছর ধরে এটি নবাবগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার মানুষের সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে আসছে। প্রতিযোগিতার দিন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ একই জায়গায় এসে আনন্দ ভাগাভাগি করেন—এটাই এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
নৌকা বাইচে ঢাকা-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক উপস্থিত ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী ‘লিটন ২’ দলের অধিনায়ক ও মাল্লাদের হাতে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি ও আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার হাতে পাওয়ার পর বিজয়ী দলের সদস্য ও সমর্থকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়।
সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কমতে থাকে মানুষের ভিড়। কিন্তু ইছামতীর বুকে তখনও যেন রয়ে যায় বৈঠার ছন্দ, ঢোলের শব্দ আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস। নদীর স্রোতের সঙ্গে মিলেমিশে কলাকোপার নৌকা বাইচ আবারও মনে করিয়ে দিল—আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মধ্যেও বাংলার লোকজ ঐতিহ্য এখনো মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে।