কুমিল্লার হোমনায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ৪০ বস্তা সরকারি চাল অন্যত্র বিক্রির উদ্দেশ্যে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় লোকজন চালবোঝাই একটি গাড়ি আটক করার পর পুলিশ চালগুলো জব্দ করে। এ ঘটনায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
ঘটনার পর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার ও ঘাগুটিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি মো. মোসলেম সরকারকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর ডিলারশিপ বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
সন্দেহে গাড়ি আটক
বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘাগুটিয়া ইউনিয়নের দড়িচর গ্রামে চালবোঝাই গাড়িটি আটক করেন স্থানীয় লোকজন। তাঁদের সন্দেহ হওয়ায় গাড়িটি থামিয়ে চালের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। পরে পুলিশ ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাকে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে চালগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। জব্দ করা ৪০ বস্তায় ২৫ কেজি করে মোট এক হাজার কেজি চাল ছিল।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্রদের মধ্যে এসব চাল ১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রির কথা। অভিযোগ উঠেছে, নির্ধারিত উপকারভোগীদের কাছে চাল বিতরণ না করে সেগুলো অন্যত্র বিক্রির জন্য নেওয়া হচ্ছিল।
বক্তব্যে মিল নেই
চাল পরিবহনের সময় মোসলেম সরকারের সহযোগী হিসেবে পরিচিত আসাদুল্লাহকে স্থানীয় লোকজন আটক করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি চালগুলো গৌরীপুর থেকে আনা হয়েছে বলে দাবি করেন।
তবে গাড়িচালকের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। তাঁর দাবি, দড়িচরের ডিলারের গোডাউন থেকেই চালগুলো গাড়িতে তোলা হয়েছিল। পরে সেগুলো দুলালপুরের দিকে নেওয়া হচ্ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন, চালবোঝাই গাড়িটি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাঁরা আটক করেন। পরে খাদ্য কর্মকর্তা ও পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ধারণা, চালগুলো দুলালপুর বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল।
দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি
সরকারি চাল আটকের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরপর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মোসলেম সরকারকে বিএনপির সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
হোমনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘অপরাধীর কোনো দল নেই, তাদের পরিচয় তারা অপরাধী।’ অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ চাল বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, অনিয়ম করার জন্য নয়। এ ঘটনায় মোসলেম সরকারকে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মোসলেম সরকারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডিলারশিপ বাতিলের প্রক্রিয়া
হোমনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ফরিদা আবেদীন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি চাল আটকের খবর দেখে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে পুলিশ চালগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, সরকারি চাল অন্যত্র পাচারের অভিযোগে বাদী হয়ে মামলা করা হয়েছে। মোসলেম সরকারের ডিলারশিপ বাতিলের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন।
তদন্তে বের হবে কারা জড়িত
হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) টমাস বড়ুয়া বলেন, স্থানীয় লোকজন ২৫ কেজি ওজনের ৪০ বস্তা সরকারি চাল আটক করে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ চালগুলো উদ্ধার করে থানায় নেয়। এ ঘটনায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
তিনি বলেন, চালগুলো কোথায় নেওয়া হচ্ছিল এবং এর সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তদন্ত করে তা বের করা হবে।
প্রশ্ন উঠেছে তদারকি নিয়ে
দরিদ্র মানুষের জন্য নির্ধারিত সরকারি চাল ডিলারের গোডাউন থেকে বের হয়ে কীভাবে অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ পেল—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু চাল জব্দ ও মামলা করলেই বিষয়টির পূর্ণ সমাধান হবে না। চাল বরাদ্দ থেকে শুরু করে গোডাউনে সংরক্ষণ, পরিবহন ও উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ—প্রতিটি ধাপে কারা দায়িত্বে ছিলেন এবং কোথায় তদারকির ঘাটতি ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সরকারি তদন্তে ঘটনার প্রকৃত চিত্র এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।